Thursday, February 15, 2024
আর্কাইভ: শাহাদাব আকবরের সাজা মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি, প্রথম আলো ১৩-১১-২০০৯
Friday, February 5, 2016
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কার পেয়েছেন?
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি-এর ওয়েবসাইটে পুরস্কারের বিবরণীতে বিষয়টি উল্লেখ করা আছে।
শেখ হাসিনা পুরস্কার পেয়েছেন পলিসি লিডারশিপ ক্যাটেগরিতে। এই ক্যাটেগরিতে বাংলাদেশে তিনিই প্রথম এ পুরস্কার পেলেন। প্রধানমন্ত্রীকে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন।
প্রশ্ন হতে পারে, পলিসি লিডারশিপে তিনি এমন কী কাজ করেছেন, যে জন্য তিনি এ পুরস্কার পেতে পারেন?
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি কতৃর্পক্ষ যে কয়েকটি অবদানকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে, সেগুলো হলো-
এক. উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে;
দুই. শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, এটি বাস্তবায়নের জন্য ক্লাইমেট ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে;
তিন. প্রতি বছরের বাজেটের ৬ থেকে ৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজনের জন্য;
চার. ২০১১ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে বন ও জলাভূমি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, এর ফলে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ দশ শতাংশ বেড়ে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা কমিটির প্রধান ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার এমপি। কর্মপরিকল্পনাটির মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন- ২০০৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় অভিযোজন কর্মপরিকল্পনা (নাপা) প্রণয়ন করা হয়, এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ২০০৯ সালে এর একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রণীত হলো।
২০০৮ সালে যারা কর্মপরিকল্পনাটি প্রণয়ন করেন, সেই কমিটিতে ছিলেন সরকারের পক্ষ থেকে দুই যুগ্মসচিব কামার মুনীর এবং রবীন্দ্রনাথ রায়, বিআইডিএসের ড. আসাদুজ্জামান, আইইউসিএনের ড. আইনুন নিশাত, বুয়েটের অধ্যাপক রেজাউর রহমান, পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের কামরুল ইসলাম চৌধুরী, পরিবেশবিদ ড. রেজাউল করিম।
এই কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পেছনে বড় একটি ভূমিকা রাখেন ড. আতিক রহমান। ২০০৮ সালে তিনি পেয়েছিলেন চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কার। ২০০৯ সালের সংশোধিত ভার্সন প্রণয়নেও (অন্যদের পাশাপাশি) তার অবদান আছে।
মজার ব্যাপার হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনে যে বিষয়টি অনেক বেশি (সম্ভবত সবচেয়ে বেশি) অবদান রেখেছে, সেই “বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনা”টি যারা প্রণয়ন করলেন, গত কয়েকদিনের হাসি-গান-আলোচনায় তাদের কোনো দেখা মিললো না। এবং ভুলে গেলে চলবে না, কর্মপরিকল্পনাটি ২০০৫ সালের নাপা’র ধারাবাহিকতা। নাপা প্রণয়নে যাদের অবদান আছে, তারাও স্মর্তব্য।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার প্রাপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, সেটি হলো জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ করা। গত ১ জুলাই ২০১৫ বাংলা ট্রিবিউনের “জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা কার পকেটে?” শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়- “অনেক আশা আর কাজ করার প্রত্যয় নিয়ে শুরু হলেও ব্যাপক দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ আত্মসাতের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিল বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ গত ছয় বছরে রাজস্ব খাত থেকে এই তহবিলে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৯০০ কোটি টাকা!” সূত্র:http://banglatribune.com/tribune/single/103171
যে প্রকল্পটিকে ব্যর্থ বলে সরকার নিজেই স্বীকার করছে, তার জন্য সরকারপ্রধানের পুরস্কারপ্রাপ্তিকে কী বলা যায়?
তৃতীয়ত, জাতিসংঘ বলছে বাংলাদেশে প্রতি বছরের বাজেটের ৬ থেকে ৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজনের জন্য।
২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ২০ কোটি ২৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এ বছরের মোট বাজেট ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার, সে হিসেবে বরাদ্দ ০.৩৩ শতাংশ, তবে মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ছাড়াও আরো কয়েকটি প্রকল্প থাকতে পারে, যাতে জলবায়ু ও পরিবেশের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে মোট বরাদ্দ আধা থেকে এক শতাংশও হতে পারে, কিন্তু তাই বলে ছয়-সাত শতাংশ?
চতুর্থ ও সর্বশেষ বিষয়টি হলো, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। এ সংশোধনীর জন্য দেশবিদেশে শেখ হাসিনা নিন্দাই শুনেছেন বেশি, এবারে এ জন্য পুরস্কৃত হলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের জন্য বিখ্যাত এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদটি যুক্ত হয়। এতে বলা হয়েছে- “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।”
জাতিসংঘ বলছে, এই সংশোধনীর কার্যকরী প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার হিসেবে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১০ অনুসারে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার।
বাংলাদেশের বনভূমির হিসেব নিয়ে সরকারি তথ্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে। কিন্তু সংখ্যাটি যে ক্রমাগত কমছে, এটি নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। অংকে আমি একটু কাচা, তাই দশ শতাংশ বৃদ্ধির হিসেব মেলাতে পারছি না।
ডানকান, ইকোনোমিক জোন আর একজন দীপার গল্প
উইলিয়াম ডানকান সেই তুলার কারবারই শুরু করলেন আরেক ব্রিটিশ প্যাট্রিক প্লেফেয়ারের সাথে। ১৮৫৯ সালে ভাই ওয়াল্টার ডানকানকেও নিয়ে এলেন। দুই ভাই আর প্যাট্রিক মিলে শুরু করলেন তুলার কারবার। কোম্পানির নাম হলো মেসার্স প্লেফেয়ার, ডানকান ব্রাদার্স এন্ড কোং, মোকাম ৬৪ ক্লাইভ স্ট্রিট, কলিকাতা।
ক্লাইভ স্ট্রিটের যে বাড়িতে অফিস, ওই একই বাড়িতে আরেক কামরায় বসে চায়ের ব্যবসা করতেন চার্লস লেকি নামের আরেক ইংরেজ। ভারতবর্ষে সবে চায়ের চাষ শুরু হয়েছে, ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনীছড়ায়। যুদ্ধের জন্য চীনা চায়ের রপ্তানি বন্ধ, এদিকে ব্রিটিশদের বেড টী ছাড়া ঘুমই ভাঙ্গে না। কাজেই হাজার হাজার একর জমি অধিগ্রহণ আর হাজার হাজার মানুষকে ক্রীতদাস করে চায়ের উৎপাদন শুরু হলো ভারতবর্ষে- সিলেটে। সরকারি অনুকম্পা ও আতিশয্যে চার্লসের চায়ের কারবার রমরমা।
১৮৬০ সালের শেষ দিকে চিকিৎসার জন্য বছর খানেকের জন্য বিলেত যেতে হলে ভদ্রলোক ব্যবসা দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান ডানকান ভাইদের। সেবারই চায়ের ব্যবসার সাথে ওদের পরিচয়। চার্লস ফিরে এলে ফের শুরু শুধুই তুলার ব্যবসা।
ইত্যবসরে বাংলার তাঁতশিল্পে কোস্পানির থাবা পড়েছে, তা চলছে মহারাণীর আমলেও। মসলিন তাঁতীদের হাত কেঁটে দেয়া হচ্ছে, তুলাচাষীদের বাধ্য করা হচ্ছে নীলচাষে। তুলা ব্যবসায়েও রমরমা ভাব মলিন হচ্ছে। সে ঝড়ের ঝাপটা ডানকান ভাইদের গায়েও লাগলো। ১৮৬৯ সালে ওয়াল্টার ব্যবসা ছেড়ে চলে গেলেন গ্লাসগো। বনিবনা না হওয়াতে প্যাট্রিকের সাথেও যৌথ ব্যবসা টিকলো না, আলাদা হয়ে গেলেন ১৮৭৪ এর ডিসেম্বরে।
মড়ার কলিকাতায় পড়ে রইলেন একা উইলিয়াম, যেভাবে একাই নেমেছিলেন কলকাতা বন্দরে। আর পড়ে রইলো নামসর্বস্ব নতুন কোম্পানি ডানকান ব্রাদার্স এন্ড কোং। ঠিকানা সেই ৬৪ ক্লাইভ স্ট্রিট (পরে নামকরণ করা হয় নেতাজী সু্ভাষ বোস সড়ক)।
কয়েক বছর তুলা চালাচালি করে হঠাৎ প্রতিবেশি চার্লসের চায়ের ব্যবসার কথা মনে পড়লো। ১৮৮০ সালে ছোট লাটের কাছে কিছু জমির আবদার করলেন, উদ্দেশ্য চা বাগান করবেন। সরকার ভাগ্যবিড়ম্বিত যুবকের অনুরোধ রাখলো, চায়ে সরকারের অতিশয় ভক্তি কিনা! সিলেটের মাধবপুর এবং আশেপাশের এলাকায় পাঁচ হাজার (প্রকৃত আয়তন ৫৮০৬.৯৮ একর) একর জমি অধিগ্রহণ করে দেয়া হলো। সাথে উপহার দেয়া হলো শ্রমিকশোষক আইন, গিরমিট চুক্তি। অর্থাৎ শ্রমিক বংশানুক্রমে শুধু কাজই করে যাবে, কোনো মাইনে পাবে না বললেই চলে।
উৎপাদন খরচ প্রায় শূন্য হলে যে কোনো ব্যবসাই লাভজনক হতে বাধ্য। আর সে লাভের গুড়ের টানে গ্লাসগো থেকে ওয়াল্টারও উড়ে এলেন মৌমাছির মতো। ডানকান ব্রাদার্স সত্যিকারের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মহীয়ান হলো। ৩০ বছরের মধ্যে পাঁচ হাজার একর জমি পঞ্চাশ হাজার একরে পরিণত হলো, সরকার বাহাদুর একের পর এক জমি অধিগ্রহণ করে ব্রিটিশ ভাইদের দিলেন।
১৯৪৭ সালে সদাশয় ইংরেজ সরকার ভারত শাসনের ভার আর বইতে পারলেন না, কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের হাতে দুই দেশ তুলে দিয়ে পালালেন। বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী। কাজেই হোক ইংরেজ, পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশদের তাড়ালেন না, অধিকৃত জমি আর ব্যবসা যেমন যেমন ছিল, তেমনই রইলো। একাত্তরে পাকিস্তানও গেল, বঙ্গবন্ধু দেশজুড়ে সবই প্রায় জাতীয়করণ করলেন। কিন্তু রাখে খোদা মারে কে, ডানকান ভাইরা রয়ে গেলেন। ১৯৭২ সালে অধিকৃত জমি লীজের মেয়াদ নবায়ন করা হলো।
সব চলছিলো ভালই। গোল বাঁধলো ২০১৫-তে এসে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে করা নির্বাচনী অঙ্গিকার মতো আওয়ামী লীগ চাইছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অর্থনৈতিক অঞ্চল করবে, দেশজুড়ে লাখো ব্যবসায়ীদের নিয়ে গড়া সাড়ে সাতশো ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবি এটি। শুধু অর্থনৈতিক অঞ্চল নয়, আলাদা শিল্পাঞ্চলও চাইছেন তারা। মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা চান আলাদা মুদ্রণ শিল্পাঞ্চল, সফটওয়্যার ব্যবসায়ীরা চান আলাদা সিলিকন ভ্যালী ইত্যাদি। সব করা না গেলেও অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হয়তো সম্ভব। সে মতেই হবিগঞ্জে ডানকানকে লীজ দেয়া পাঁচশো একর জমির (প্রকৃতপক্ষে ৫১১.৮৩ একর) লীজ বাতিল করে সে জমি সরকার ফিরিয়ে নিয়েছেন। কোম্পানিও তা মেনে নিয়েছে হৃষ্টচিত্তেই, সাড়ে ঊনপঞ্চাশ হাজার একর তো রইলো এখনো!
বিপদে পড়েছে চা-শ্রমিকরা। চা বাগানে যারা গিয়েছেন, শ্রমিকদের ঘরে, চিলতে উঠোনে দু'এক সপ্তাহ থেকেছেন, তারা জানেন, বাগানের পাশে এক ধরনের ঘেটোর মধ্যে থাকেন শ্রমিকরা। এ জীবনযাপনকে মোটেই মানবেতর বলা যাবে না। ওতে মানবেতর শব্দের অবমান হয়। ফার্মের পশুরা তো বিলাসী জীবনযাপন করে, ওদের কথা আলাদা, গৃহস্থ বাড়ির গরুছাগলও থাকে না- এমন বাড়িঘরে ঠাসাঠাসি করে থাকে চা-শ্রমিকেরা। শুনে হেসে খুন হবেন, এরই মাঝে শ্রমিকের বাচ্চারা স্কুলে যায়, ফুটবল খেলে, নাটক করে, গান গায়। যেবার তথ্যচিত্র করতে গেলাম দীপা নামের চৌদ্দ বছরের একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হলো, সে সিলেট বিভাগীয় নারী ফুটবল দলের ডিফেন্ডার। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে পুরো টুর্নামেন্ট সিলেটকে ডিফেন্ড করেছে সে, চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সিলেট। কিন্তু এখন দীপাকে ডিফেন্ড করার কেউ নেই। ওরা যে ঘরে থাকে সেখানকার জমি সরকার নিয়ে নিয়েছে। পঞ্চাশ হাজার একর জমির মধ্যে ডানকান শুধু সেই পাঁচশো একর জমিই ছাড়লো যেখানে শ্রমিকদের আবাস। সরকারের ভাষায়, "ওই জমিতে চা চাষ করার কথা থাকলেও, ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি পুরো জমিতে তা করছে না।" (তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫)।
গৃহহীন দীপাদের আওয়াজে আসল কথাটিও কেউ কেউ বলছেন- শ্রম শোষণ। গিরমিট চুক্তি এখন আর না থাকলেও শ্রমিকরা আছেন ওই একই প্রথায়। পৃথিবীর কোনো স্বাধীন, সভ্য দেশে এমন কোনো প্রথা থাকতে পারে? গার্মেন্টেসে কমপ্লায়েন্সের অভিযোগে ব্রিটিশ মডেল বাংলাদেশি কাপড় খুলে ছুড়ে দেন, প্রতিবাদের মিছিলে টিভিতে বাইট দেন, তারপর? বাড়ি ফিরে ডানকান চায়ে গলা ভেজান? কিংবা অন্য কোনো কোম্পানির, যা বাংলাদেশ থেকেই গেছে। কই কোনোদিন গরম চায়ের পেয়ালা উইলিয়ামের মুখে ছুঁড়ে মারতে পারলেন না তো! আন্তোনিও হাসেন্তির কথা মনে পড়ে? বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়? কিংবা সব্যসাচীর আবৃত্তি?
"সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না
আমারই কপালের ঘাম দিয়ে গাছগুলোকে
তৃষ্ণা মেটাতে হয়
সেখানে যে কফি ফলে, আর চেরি গাছে
যে টুকটুকে লাল রঙের বাহার ধরে
তা আমারই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, যা জমে কঠিন হয়েছে
কফিগুলোকে ভাজা হবে, রোদে শুকোতে হবে,
তারপর গুড়ো করতে হবে
যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের গায়ের রঙ হবে
আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ
আফ্রিকার কুলির জমাট রক্তে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ।"
আফ্রিকার কফি আর সিলেটের চা-- শ্রমিকের রক্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।
ও, বলতে ভুলে গেছি- দীপা নাটকও করে। আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করে, "আপনি নাটক বানাইলে আমাকে বলবেন, আমি অভিনয় করবো"। আমিও মজা করে বলি, তুই অভিনয় করবি কিরে, তুই তো ঠিকঠাক বাংলায় কথাই বলতে পারিস না। ওর অনুযোগ, "কেন, পাতর (পাত্র) ভাষায় নাটক বানাবেন।" আমি বললাম, বাংলা ছাড়া আর কোনো ভাষা বাংলাদেশের মিডিয়া এমনকি সরকারও অনুমোদন করে না, চাকমা ভাষায় করা অং চাকমার অনুদানের সিনেমা সেন্সর বোর্ড আটকে দিয়েছে জানিস না?
দীপারা যেদিন চ্যাম্পিয়ন হলো, সেদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হেরেছে ভারতের কাছে। প্রথম আলোর প্রথম পাতায় চার কলাম ছবি, তিন কলাম খবর; খেলার পাতায় পুরো আট কলামই মুশফিকদের দখলে। খেলার দ্বিতীয় পাতার একদম শেষ খবরটি দীপাদের- এক কলাম দেড় ইঞ্চি। হারুক জিতুক প্রথম আলো পুরুষ ক্রিকেটের সঙ্গে আছে, তারপরেও তো দেড় ইঞ্চি দিয়েছে, অন্য কাগজে তাও নেই।
তাই দীপাদের আন্দোলনের খবরও মিডিয়াতে নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও ওদের সাথে নেই। আমি ইকোনোমিক জোনের পক্ষের লোক, এ নিয়ে টিভিতে অ্যাডভোকেসি মার্কা প্রোগ্রামও করেছি, এখনও করছি। কিন্তু সেটা মরার বসতভিটা আর সামনের খোলা জায়গাটুকুতে কেন, যেখানে ফসলের মৌসুমে ওরা খানিক চাষ করে আর শুকনো মৌসুমে দীপারা ফুটবল খেলে, নাটক করে। ম্যানেজারের বাংলো, এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের বাংলোর আশেপাশে সবমিলিয়ে এরচে' ঢের বেশি জায়গা পড়ে আছে।
তারও বড় প্রশ্ন- চা বাগানে শ্রম শোষণ থামবে কবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে মেট্রোরেল বিতর্ক প্রসঙ্গে
ঢাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনা বিশেষ করে যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট কোনো পরিকল্পনা করতে গেলে প্রভাবশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় ক্যান্টনমেন্ট আর বিডিআর। মাঝে মাঝে অন্য কেউ যদি ওদের মতোই দাপট দেখায়, ‘ব্লাডি সিভিলিয়ান’ দর্শক হিসেবে সেসব দেখতে মজাই লাগে।
যেমন ধরুন, মেট্রোরেল প্রকল্প।
আরো দশ বছর আগেই হয়তো মেট্রোরেল হয়ে যেতো যদি দাতা সংস্থা জাইকার সাথে সরকারের আলোচনা আরো গতিশীল হতো। উত্তরা থেকে মতিঝিল যাওয়ার স্বাভাবিক রাস্তা হলো এয়ারপোর্ট বনানী হয়ে। স্বাভাবিকভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ রুটেই মেট্রোরেল করতে জাইকার আগ্রহ ছিল, কিন্তু উত্তরপাড়ার জাঁদরেল বাবুদের সরকার সেই রুটে রাজি করাতে পারেনি। এ নিয়ে টানাপোড়েনে চলে গেছে কয়েক বছর। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের সক্ষমতাও বেড়েছে। মেট্রোরেলের প্রধান অর্থ জোগানদাতা জাইকাকেও শেষাবধি উত্তরের কাছে হার মানতে হয়েছে।
প্রভাবশালীদের দাপটে উত্তরা থেকে মিরপুর পল্লবী আগারগাঁও হয়ে ঘুরপথে যে মেট্রোরেল হচ্ছে তা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে হোঁচট খেয়েছে।
দর্শক হিসেবে বলতেই হচ্ছে, ‘বিষম মজা’!
তবে যেসব যুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দিয়ে মেট্রোরেলের বিরোধিতা হচ্ছে তা অনেকটাই হাস্যকর।
যেমন একজন লিখেছেন, “অন্য রেললাইনের মত টিএসসির পাশেও কাঁচা বাজারের দোকান বসবে, টিএসসির নাম হবে তখন টিএসসি বাজার, সদরঘাটের কাছে হওয়ায় এ বাজারে মাছের দর কম থাকবে”।
কেউ কেউ অবশ্য এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্ট এবং হিস্টোরিকাল ইমপরট্যান্স সার্ভে রিপোর্টের রেফারেন্সসহ যুক্তি দিয়েও আপত্তিগুলো তুলে ধরছেন।
পত্রপত্রিকায়, অনলাইনে, ফেসবুকে এবং সাধারণ আলোচনায় সবমিলিয়ে মোটামুটি তিনটি আপত্তি দেখা যায়-
এক. শব্দদূষণ ও কম্পন, দুই. ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্থাপনার ক্ষতি, তিন. ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ঝুঁকি।
শব্দদূষণ এবং কম্পনের ক্ষেত্রে মেট্রোরেলের রুট নিয়ে করা প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপে নেতৃত্বদানকারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হকের একটি উক্তিকে রেফারেন্স হিসেবে হাজির করা হয়। তিনি বলেছেন, “শাহবাগ থেকে টিএসসি, কার্জন হল- এই এলাকাটা ইনস্টিটিউশনাল এরিয়া। এখানে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে। এখান দিয়ে মেট্রোরেলের রুট যেতে হলে সাউন্ড প্রুফ ও ভাইব্রেশন কন্ট্রোলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তা না হলে রাজু ভাস্কর্যসহ যে সব স্থাপনা আছে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত, এমনকি ভেঙে যেতে পারে।” (বিডিনিউজ, ১৪ জানুয়ারি ২০১৬)
‘সতর্কতা অবলম্বন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে মেট্রোরেলের রুট নেওয়া হলে কোনো ক্ষতি হবে কি না জানতে চাইলে অধ্যাপক মোজাম্মেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাউন্ড প্রুফ ও ভাইব্রেশন মিনিমাইজ করলে তা হবে না”।’
মোটামুটি এটা যে কোনো পাগলেও বোঝে- শব্দ ও কম্পন নিয়ন্ত্রণ না করে নির্মাণ কাজ করা হলে পৃথিবীর যে কোনো স্থানে যে কোনো স্থাপনারই ক্ষতি হতে পারে।
এবং এখানেই মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন- আপনাদের শব্দ ও কম্পন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কী?
প্রযোজক কাজল আবদুল্লাহ যেভাবে বলেছেন, “যে যাই বলুক, একফোটা শব্দ হবে না বা শব্দে এদের সমস্যা হবে না। এটা আমি মানতে রাজি নই”, আমি সেভাবে বলতে চাই না। যুক্তিসঙ্গত, বিজ্ঞানগ্রাহ্য সমাধান থাকলে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন, পাবলিক লাইব্রেরির পেটের ভেতর দিয়েও মেট্রোরেল চালিয়ে নিতে রাজি আছি। পৃথিবীর বহু দেশেই বহুতল ভবনের ভেতর দিয়ে পর্যন্ত মেট্রোরেল গেছে, সেসব ছবি আজকাল ফেসবুকে বেশ দেখছি।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যোগাযোগ মন্ত্রী এবং সরকারের কেউ কেউ জনসভায় কিছু কথা বলছেন, যার অর্থ মেট্রোরেল চুপি চুপি ক্যাম্পাসের পাশ দিয়ে চলে যাবে, কেউ টেরটিও পাবে না।
আবার সরকারের সমর্থক কিছু অ্যাক্টিভিস্ট এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টকে ধরে পরিবেশের (শব্দ ও কম্পন) ক্ষতি ন্যূনতম রাখার ক্ষেত্রে মেট্রোরেলের ব্যবহৃত ম্যাস স্প্রিং সিস্টেম বা এমএসএস পদ্ধতিটিকে সামনে হাজির করছেন।
দুই পক্ষের সম্মানজনক জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কের প্রেক্ষিতে আগ্রহবশত এ নিয়ে কিছু পড়াশোনা করলাম। পৃথিবীর প্রথম দিককার মার্ক্সিস্ট পার্টি জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের বিখ্যাত নেতা Hans Georg Wagner, যিনি একজন বিজ্ঞানী এবং জার্মানির স্থপতি ও প্রকৌশলীদের নেতাও বটে, তার একটা লেখা পেয়ে গেলাম। খুবই সহজ ভাষায় লেখা এ প্রবন্ধে তিনি বলছেন, "With well designed, low-tuned floating trackbeds, high vibration attenuation levels can be reliably achieved. Supported on steel springs, long slabs or troughs provide advantages in terms of construction, installation and performance. Several applications are shown. The springs are generally accessible. They allow the fast and easy readjustment of deviated track levels. Being fatigue-proof and provided with an excellent anti-corrosion system, the springs are designed to a long lifetime".
শুধু তা-ই নয়, তিনি মোটামুটি অঙ্ক কষে দেখাচ্ছেন ট্রেনের গতি এবং স্প্রিংয়ের আকারের ওপর নির্ভর করে শব্দ ও কম্পন মাত্রা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আরো যারা আগ্রহী তারা ২০০৮ সালে প্রকাশিত Noise and Vibration Mitigation for Rail Transportation Systems edited by Burkhard Schulte-Werning, David Thompson, Pierre-Etienne Gautier, Carl Hanson, Brian Hemsworth, James Nelson, Tatsuo Maeda, Paul de Vos বইটি পড়ে দেখতে পারেন। অনলাইনে বিনামূল্যেই বইটি পড়তে পারবেন।
কিন্তু আমি বা আপনি এসব বই পড়লে শুধু আমাদের জ্ঞানই বাড়বে। ঢাকা মেট্রোরেলে কী প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, সে ব্যাপারে কোনো উত্তর মিলবে না।
উত্তরটি মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। তাদের জানাতে হবে, কোন্ প্রযুক্তি, কীভাবে তারা ব্যবহার করবেন এবং এটি করলে আসলে কী ক্ষতি হবে কিংবা হবে না।
আর, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা নষ্টের বিষয়টি আপেক্ষিক। রাজু ভাস্কর্য ঐতিহ্য নাকি টিএসসি? টিএসসির সামনে রাজু ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠা করে টিএসসির ঐতিহ্য, নান্দনিকতা নষ্ট করা হলো কেন? এসব প্রশ্ন থাক।
আমার কাছে মেট্রোরেল বলতেই মনে পড়ে কুড়িল ফ্লাইওভারের বিশালত্ব, মগবাজার ফ্লাইওভারের কর্মযজ্ঞ। যদিও মেট্রোরেল এর চেয়ে অনেক কম জায়গা নিয়ে চলবে এবং এর পিলার ও লাইনের প্রস্থও হবে অনেক কম। কিন্তু সেই কম জায়গাটুকু কতো? তিন ফুট? ছয় ফুট? দশফুট? শাহবাগ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফুটপাতের ওপর দিয়েই যদি মেট্রোরেল চলে যায় আমি তো টেরও পাবো না ওপরে কিছু আছে। কিন্তু তা যদি ফ্লাইওভারের মতো ঢাউশ হয়, তবে তা ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে, এমনকি পাশ দিয়ে নিয়ে যেতেও আমার আপত্তি আছে।
মোদ্দাকথা, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে পষ্ট করতে বলতে হবে, রেললাইনের প্রস্থ আসলে কতো? এর পিলারগুলো কতো চওড়া হবে এবং সেগুলো কোন্ কোন্ পয়েন্টের ওপর দিয়ে যাবে আর তার উচ্চতাই বা কী। বিশ্ববিদ্যালয়ের তো বটেই সারা দেশেরই ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক স্থাপনার দর্শনদারিতে অনেক ক্ষতি উন্নয়নের নামে আমরা নিজেরাই করেছি, উন্নয়নের “স্বার্থে” আরো কিছু ক্ষতি মেনে নিতেও আমরা প্রস্তুত, কিন্তু কতোটা?
তৃতীয়ত, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ঝুঁকি। রেললাইনের পাশে মাছের আড়ত বসলে কিংবা ছিন্নমূল মানুষের বস্তি গড়ে উঠলে নিরাপত্তা আসলেই হুমকির মুখে পড়বে। তবে এ নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব চিন্তিত নই। কোনো ফ্লাইওভারেই এখন পর্যন্ত মাছের আড়ত বসেনি, বস্তিও হয়নি। উচ্চতার কারণেই সম্ভবত কারওয়ান বাজার বা গুলিস্তান হয়ে ওঠেনি ফ্লাইওভারগুলো। আর মেট্রোরেলের প্রস্থ এবং উচ্চতা কোনোভাবেই সম্ভবত এ ধরনের সম্ভাবনা অনুমোদন করে না। শাহবাগে বাস স্টপেজ থাকলে যদি বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে না পড়ে, তাহলে মেট্রোরেলের স্টপেজেও পড়বে না।
তবে দোয়েল চত্বরের পাশ দিয়ে শাহবাগের মতো গণপরিবহনের গতায়ত কম। কাজেই সেখানে জনসমাগম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে। যদিও দোয়েল চত্বরে স্টপেজ থাকলে বইমেলাগামী মানুষের জন্য তা ভালই হবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে বইমেলায় লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ হলে যদি বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে না পড়ে তাহলে দোয়েল চত্বরে স্টপেজ থাকলেও সম্ভবত হবে না। উপরন্তু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এবং সদরঘাটের যাত্রীদেরও উপকার হবে। তবে সরকার চাইলে এই স্টপেজটি দোয়েল চত্বরে না করে আরেকটু এগিয়ে হাইকোর্ট মাজারের সামনে করা যেতে পারে। যদিও প্রেস ক্লাবের সামনে পরবর্তী স্টপেজটি সেক্ষেত্রে অনেকটাই অর্থহীন হয়ে যায়।
অর্থাৎ সব আলোচনার আগের কথা হলো- সরকারের প্রতিক্রিয়া, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। প্রকল্পের শুরুতেই এ বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা এবং জনমত গঠন প্রয়োজন ছিল। সে নিয়ে একটি কমিটি এবং আলাদা বরাদ্দও ছিল, যতোদূর জানি। কিন্তু সুবিধান্বেষী ডিগবাজ মার্কা এক্সপার্টদের দিয়ে যেমন কোনো কাজ হয় না, এই কমিটিও যে তেমন কোনো কাজ করতে পারেনি, এখনকার অবস্থা তার একটি প্রমাণ।
পিপলস ফেডারেশন কেন জরুরি?
ডাচ বাংলা ব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে অদক্ষ ব্যাংক?
Sunday, August 23, 2015
খ্রিস্টান হলে কতো টাকা পাওয়া যায়?
সম্প্রতি আমার এক খ্রিস্টান বন্ধু হয়েছে।
তিনিই প্রথম নন। আমার জীবন খ্রিস্টান বন্ধুর প্রস্থান-আগমনে পরিপূর্ণ।
প্রত্যেক খ্রিস্টান বন্ধুকে আমি প্রশ্ন করি- শুনেছি খ্রিস্টান হলে টাকা দেয়, বিদেশে পাঠায়; কতো টাকা দেয়? কোন্ দেশে পাঠায়?
শুনে বন্ধু বলে- আটত্রিশ হাজার টাকা। আমেরিকা পাঠায়।
আমি বললাম- একটু খোঁজ নিও তো, আমি তাহলে খ্রিস্টান হবো।
বন্ধু আচ্ছা বলে চলে যায়। খোঁজ জানায় না।
আমি বারকয়েক ফোন করি, টাকার কথা জিজ্ঞেস করলেই ফোন কেটে দেয়।
মনে হলো, কোথাও গড়বড় আছে। আসলে হয়তো খ্রিস্টান হলে টাকা দেয় না, পুরোটাই গুজব। এসব প্রশ্ন করে বেচারার মনে কষ্ট দিয়েছি।
তবু বন্ধুকে আবার ফোন দেই- আসলেই টাকা দেয় না?
বন্ধু বলে- তুমি তো সাংবাদিক, তুমি খোঁজ নাও।
আমি আসলেই সাংবাদিক, তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদক না। প্রতিবেদন ছাড়াও যে সাংবাদিকতার হাজারটা ধরন আছে, তা দূতাবাসের লোকজনও বোঝে না। সাংবাদিক পাসপোর্ট হাতে পেলেই জিজ্ঞেস করে কী রিপোর্ট করেন, কোন্ বিটের সাংবাদিক ইত্যাদি।
আমি আমার সহকর্মীদের জিজ্ঞেস করি, খ্রিস্টান হলে কতো টাকা দেয়?
তারা অবাক হয়ে যায়- এই বয়সে আপনি খ্রিস্টান হবেন?
যেন খ্রিস্টান হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো বয়স আছে। পনের থেকে পঁচিশ বছরের বাইরে কেউ খ্রিস্টান হতে পারবে না। আরে যিশু নিজে খ্রিস্টান হয়েছেন কতো বয়সে?
আলোচনায় বুঝি- খ্রিস্টান হলে টাকা দেয় কিনা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না, কারো কাছে কোনো প্রামাণ্য তথ্য নেই।
একজন বললেন, ইহুদি হলে টাকা পাবেন।
বাংলাদেশে ইহুদি হবো কিভাবে? ইজরায়েল যাওয়া তো পাসপোর্টে নিষিদ্ধ। বাহাই সম্প্রদায়ের লোকজন হজ্বে যাওয়ার নাম করে ইজরায়েল যায় এটা জানি। সৌদি সরকারের সাথেই ওদের গোপন চুক্তি আছে, সরকারই আনঅফিসিয়ালি পুরো কাজটা করে দেয় বা করতে দেয়।
বৌদ্ধ হলে টাকা পাওয়া যায়? পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে জাপানি টাকায় অনেক মিশন চলে দেখেছি। সেখানে কোনো গণ্ডগোল হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগে জাপানি দূত পৌঁছে যান।
জাপানি মুদ্রার নাম কি? ইয়েন? বৌদ্ধ হলে পকেটে ইয়েন ঝনঝন করবে?
আমার সাধের চুলগুলো বিসর্জন দিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে যাবো?
মুসলিম কিভাবে হয়? আপাতত মুসলিম হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই, মুসলিম হলে টাকা কিংবা দেশভ্রমণের কোনো নজির আছে বলে জানি না। দেখা যাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে পাঠিয়ে দেবে, পৃথিবীর দ্বিতীয় বসবাস-অযোগ্য শহরে।
হিন্দু হওয়া যেতে পারে অবশ্য। ভূমিকম্প হলেও নেপাল দেশ হিসেবে খারাপ না। কিন্তু আমার বাবা বলেন- জন্মসূত্রে ছাড়া হিন্দু আর আওয়ামী লীগার হওয়া যায় না।
আমার বিস্তর সন্দেহ আছে এ বিবৃতিতে, তবু লোকশ্রুতি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বিশেষ করে শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক প্রবীর সিকদারও দেখলাম লিখেছেন- রক্তে আওয়ামী লীগ না থাকলে আওয়ামী লীগার হয় না।
এককালে বাকশাল নেতা আব্দুর রাজ্জাকও একই কথা বলেছিলেন, পরশু মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও একই কথা বলেছেন।
তাই টাকা প্রাপ্তির যতো সুযোগই থাকুক না কেন, আওয়ামী লীগার হওয়া সম্ভব নয়।
বন্ধুকে আবার ফোন দিতে হবে। এতো এতো মানুষ যেহেতু খ্রিস্টান হলে টাকা পাওয়ার কথা বলছে, জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে শেষবার ফোন করেই দেখি!
Sunday, January 2, 2011
ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ও বিনায়ক প্রশ্ন
যদিও শেষাবধি মাওবাদীরা বিনায়ক সেনের প্রহসনমূলক শাস্তির প্রতিবাদে “প্রতিবাদসপ্তাহ” পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, কিন্তু শুরু থেকেই তাকে তাদের দলীয় কর্মী বলে স্বীকার করেনি দলটি। বিনায়ক নিজেও কখনো সেই দলের কর্মী ছিলেন না বলে দাবী করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিনায়ক একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং মানবাধিকারকর্মী। ভেলোর ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ ডাক্তারি পাস করে ছত্তিশগড়ের আদিবাসী শিশু ও দুঃস্থ মানুষদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন এক হাসপাতাল। মানবতার সেবার জন্য তাকে ইউনেস্কো পদক, গ্লোবাল হেলথ কাউন্সিল এওয়ার্ড সহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা দেয়া হয়। জাতিসংঘ আহ্বান জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী মানবতাবাদীরা যেন তার মডেলকে অনুসরণ করে এগিয়ে আসেন।
আসুন দেখা যাক, তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ করছে ভারত সরকার। বিনায়ক সেনের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, তিনি আটক মাওবাদী দার্শনিক নারায়ণ সান্যালের চিঠি কলকাতার ব্যবসায়ী পীযূষ গুহের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। বিনায়ক সেন জানিয়েছেন, জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নারায়ণের সাথে দেখা করেছেন বিনায়ক। চিঠি চালাচালির কথাও স্বীকার করেছেন বিনায়ক, নারায়ণ এবং পীযূষ- তিনজনেই। তারা জানিয়েছেন, যথাযথ জেল কোড মেনেই সে চিঠি নেয়া হয়েছিলো, জেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সীলমোহর-ও ছিল তাতে।
কিন্তু তাতে কী? নারায়ণের জেলে আটক থাকার প্রায় ১ বছর পর পুলিশ উদ্ধার করে ৩ টি চিঠি, যেগুলোতে জেল কর্তৃপক্ষের কোনো সীল নেই। পুলিশ বলেছে, এই চিঠিগুলো নারায়ণের লেখা এবং সেগুলো পাঠানো হয়েছিল পীযূষকে এবং তা বয়ে নিয়ে গেছেন বিনায়ক। এই ৩ টি চিঠি ও অভিযোগ ৩ টির কথা তিনজনেই অস্বীকার করেন। কিন্তু আদালত মেনেছেন পুলিশের অভিযোগই। যে আইনে বিনায়কের বিচার হচ্ছে, সেই বিশেষ আইনের ১০ (ক)-এর ১ ধারা মতে বিনায়কের সর্বোচ্চ ২ বছরের সাজা হবার কথা এই অভিযোগে। আর ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০(খ) ধারা অনুসারে, “গুরুতর” শাস্তিপ্রাপ্ত আসামীর অননুমোদিত চিঠি বহনের শাস্তি সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড।
বিনায়কের বিরুদ্ধে ২ নম্বর অভিযোগ, বিনায়ক সেন আটক মাওবাদী দার্শনিক নারায়ণ সান্যালের সাথে ৩০ দিনে ৩৩ বার দেখা করেছেন। বিনায়ক জানিয়েছেন, নারায়ণের সার্জারির ডাক্তার হিসেবে পুলিশের উপমহাপরিদর্শকের স্বাক্ষরিত অনুমতি নিয়েই তিনি তার সাথে দেখা করেছেন। সেই অনুমতিপত্রও আদালতকে দেখানো হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে ৩ নম্বর অভিযোগ, স্ত্রী ইলিনাকে প্রেমপত্র লেখা। রাজনন্দীগাঁও থেকে পুলিশ এই চিঠি উদ্ধার করেছে। পুলিশের অভিযোগ, তাদের ব্যক্তিগত চিঠি সেখানে কিভাবে গেল? বিনায়ক সেন জানিয়েছেন, বিয়ের আগে যেহেতু তারা দু’জন দুই জায়গাতে থাকতেন, কাজেই চিঠিটি অন্যত্র পাওয়া গেছে।
৪ নম্বর অভিযোগ, ফারসগড়-এর ডাস্টবিন থেকে গোন্ডি (গোদ আদিবাসীদের ভাষা) ভাষায় লেখা কিছু ময়লা কাগজের টুকরা পাওয়া গেছে। এগুলোর কোনোটিতে বিনায়কের নাম, কোনোটিতে ইলিনার নাম, কোনোটিতে রাজেন্দ্র সায়্যালের নাম লেখা। বিনায়কের আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, ডাস্টবিনের ময়লা কাগজগুলো থেকে কোনো কিছুই স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে না, সুতরাং এই বিষয়ে তারা ডিফেন্ড করা থেকে বিরত থেকেছেন।
বিনায়কের বিরুদ্ধে ৫ নম্বর অভিযোগ হলো- বিনায়ক নারায়ণের সুস্থতা কামনা করে একটি শুভেচ্ছা কার্ড পাঠিয়েছেন। বিনায়ক জানিয়েছেন, চিকিৎসক হিসেবে রোগীর সুস্থতা প্রত্যাশা করেছেন তিনি।
৬ নম্বর অভিযোগ হলো- মদনলাল বারকাদে নামে জনৈক ব্যক্তি ডাকযোগে বিনায়ককে একটি চিঠি দিয়েছেন। মদনলাল তখন বিলাসপুর জেলে আটক ছিলেন, তিনি চিঠিতে জেলখানায় তার ওপর নিপীড়নের চিত্রটি বিনায়ককে জানান। বিনায়ক জানিয়েছেন, জেল থেকে কেউ তাকে চিঠি লিখলে, সে বিষয়ে তাকে কেন দোষী করা হবে? তাছাড়া জেলখানার যথাযথ অনুমোদন নিয়েই ডাকযোগে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে এবং মানবাধিকার সংস্থা পিইউসিএল-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিনায়ক সেন এই চিঠি প্রেস কনফারেন্স করে সাংবাদিকদেরকে দেখান। সুতরাং এখানে তার পক্ষ থেকে লুকোছাপার কোনো ব্যাপার ছিল না।
৭ নম্বর অভিযোগ- স্বামী তুষার কান্তি ভট্টাচার্যকে লেখা স্ত্রী সোমা সেনের চিঠি। তুষার কান্তি তখন নকশাল আন্দোলনে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামী। বিনায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নকশালদের সহযোগিতা করেছেন। বিনায়ক জানিয়েছেন, খেলরন্জি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য তার সংগঠন কাজ করেছে এবং তারা এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছেন।
বিনায়কের বিরুদ্ধে ৮ নং অভিযোগ, বিনায়ক সেন একটি কম্পিউটার ব্যবহার করেন। হাস্যকর ঠেকলেও এটাই সত্যি এবং এই ধরনের অভিযোগেই তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা তার কম্পিউটারটি জব্দ করে নিয়ে যায় এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানায়, এর মাধ্যমে কিংবা এর মধ্যে বেআইনী কাজের কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু ভারতীয় পুলিশ কম্পিউটারটিকেও একটি অপরাধ হিসেবে আদালতে অভিযোগ দায়ের করে।
৯ নম্বর অভিযোগ হচ্ছে, সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদপত্রের সংবাদ বিনায়ক পত্রিকা কেটে সংরক্ষণ করেন এবং টিভির সংবাদ রেকর্ড করে সিডিতে রাখেন। বিনায়ক জানিয়েছেন, মানবাধিকার সংগঠনের এটি একটি নিত্যকার কাজ।
বিনায়কের বিরুদ্ধে ১০ নম্বর অভিযোগ পিএইচডি গবেষক অমৃতা শ্রীবাস্তব ছত্তিশগড়ে একটি ব্যাংক খোলার সময় বিনায়ক তার ইন্ট্রোডিউসার (পরিচয় দানকারী) ছিলেন। ছত্তিশগড় কিংবা ভারতের কোনো ব্যাংক থেকেই এই ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য অমৃতা শ্রীবাস্তব ২০০৫ থেকে নিখোঁজ। পুলিশের অভিযোগ সে নকশালপন্থী, বর্তমানে সে আত্মগোপনে আছে, তবে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।
বিনায়কের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগ, অমৃতা শ্রীবাস্তবের বাসা খুঁজে দেয়ার জন্য বিনায়ক সহযোগিতা করেন এবং তাকে সেই বাড়িতে ওঠান যেখানে আগে নারায়ণ সান্যাল থাকতেন। বিনায়ক এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অমৃতা যে বাড়িতে থাকতেন ছত্তিশগড় পুলিশ দাবি করেছে, তারা সেই বাড়ি থেকেই নারায়ণ সান্যালকে গ্রেফতার করেছে; অন্যদিকে অন্ধ্র পুলিশ দাবি করেছে, তারা ভদ্রচলম থেকে নারায়ণ সান্যালকে গ্রেফতার করে ছত্তিশগড়ের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এ-ই। সর্বমোট ১১ টি অভিযোগ। এবং অভিযোগগুলোর প্রতিটিই প্রমাণ করা গেছে বলে আদালত মন্তব্য করেছে। সুতরাং অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
কী বলবেন?
কফিল আহমদ : নিঃসঙ্গ প্রমিথিউস
টিএসসি সড়ক দ্বীপে সমগীতের ১ম কেন্দ্রীয় সম্মেলনে কফিল আহমেদের গান শুনলাম আজ (শনিবার)। সেটিকে প্রেক্ষিত করেই দু’চারটি কথা লিখবো ভেবেছিলাম। কিন্তু লেখাটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমনিতেই লোকে আমার লেখা পড়ে না (আগের লেখাটি পঠিত হয়েছে সাকুল্যে ৭ বার)। দীর্ঘ লেখা দিলে আরো পড়বে না। সেই ভয়ে কেটেছেটে এবং কেটে কেটে দিলাম।
●●●
কল্পনা করুন শৃঙ্খলিত প্রমিথিউস নাটকের সেই দৃশ্যটি যখন ওশেনাসের কন্যারা এলো নিঃসঙ্গ প্রমিথিউসের করুণ পরিণতি দেখতে। তারা জানতে চাইলো- সময়ের দেবতা হয়ে, যখন অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই আপনার নখদর্পণে, তখন আপনি এই নিষ্ঠুর পরিণতি কেন এড়িয়ে গেলেন না? প্রমিথিউসের জবাবটিও প্রণিধানযোগ্য- “জানা আর না জানা, সমান আমার কাছে”। কেননা, অসহায় এবং মরণশীল মানুষের অন্তরে আগুন জ্বেলে দিতে তিনি কখনো পিছপা নন।
●●●
ঘোড়াউত্রা নদীতীরের কবি স্বভাবের লাজুক ছেলে কফিল আহমেদ। হাওড়ের ভাটিয়ালি আর ভাসান গানের মুগ্ধ রাতজাগা শ্রোতা। জেলা শিক্ষা অফিসারের ছেলে হিসেবে কফিল আহমেদের ভাইয়েরা প্রত্যেকেই মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষিত। ছোট ছেলে কফিল যখন ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তখন অপর ভাইদের একজন আমেরিকা, একজন ইংল্যান্ড এবং একজন ফ্রান্সে বসবাস করছেন। বাবামায়ের আশা- মেধাবী ছাত্র কফিল-ও কোনো একটি স্কলারশীপ নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বড়ো কোনো ডিগ্রি নিয়ে বাড়ি ফিরবে। সে আয়োজনও সম্পন্ন হলো। ফরাসী দেশের শিল্প ও শিক্ষার আকর্ষণে প্যারিসের টিকেট হাতে নিয়ে বিমানবন্দর পর্যন্তই যেতে পারলেন। তারপর আর নয়। দেশ ছাড়তে পারলেন না। বাবামা কঠোর হলেন, “ঠিক আছে- এই দেশে থাকতে হলে একটি শর্তেই থাকতে পারবে। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে হবে”। তখন দেশে সেনাশাসন চলছে। সেনাদের জয়জয়কার চারিদিকে। কফিল আহমেদ সেনাবাহিনীতে ভর্তি হলেন। কিন্তু পালালেন সেখান থেকেও। এমন ‘ভাড়াটে সৈনিকে’র জীবন তার নয়। বাবামা অবশেষে শর্ত দিলেন- যেহেতু জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আছেন, জাহাঙ্গীরনগরের ইংরেজি বিভাগটি ভালো, সেখানে ভর্তি হতে হবে এবং পাস করে বিসিএস দিয়ে পররাষ্ট্র বিভাগে চাকরি নিতে হবে। শান্ত সুবোধ ছেলের মতো মায়ের বাধ্যগত লাজুক ছেলেটি এইবার যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ভর্তি হলেন, ইংরেজি বিভাগে। পাস করে বিসিএস দিয়ে ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ চাকরিও পেয়ে গেলেন। কিন্তু হাওড়ে তখন শুরু হয়েছে- ভাসানপানির আন্দোলন এবং “জাল যার জলা তার” শ্লোগানে জলমহালের ইজারাবিরোধী লড়াই। যে জেলেদের সাথে আশৈশব আকণ্ঠ আবদ্ধ ছিলেন ভাটিয়ালি-ভাসান গানের সুরের বাঁধনে, তাদের লড়াইয়ের শ্লোগানেও কণ্ঠ মেলালেন তিনি। অন্য এক কফিল আহমেদের সৃষ্টি তখনি। আসন্ন আয়েসী জীবনের হাতছানি ফেলে অসহায়-মরণশীল জেলেদের অন্তরে আগুন জ্বেলে দিতে এলেন কফিল আহমেদ।
লড়াই সশস্ত্র হলো। ইজারাদারদের ভাড়াটে “লোকাল” এবং তাদের প্রহরী বহিরাগত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে অগ্নিস্নাত জেলেদেরও হয়ে পড়তে হয় হত্যাপ্রবণ। কফিল বলেন, “আগুন তুমি ভাড়াটে লোকালের ভোট চাওয়া নও, হত্যাপ্রবণ”। যে আগুনের পরিণতি ছিলো সিগারেটের ছাইভস্মে তা এসে আশ্রয় নিলো “গেরিলার বুকে লুকিয়ে থাকা গ্রেনেডে”।
●●●
গত ২৫ বছর ধরে অবিরাম আপোসহীন লড়াইয়ে বাংলা গানের ধারায় তিনি যুক্ত করেছেন এক নতুন মাত্রা। প্রচলিত “গণসঙ্গীত” কিংবা “আধুনিক গান”-এর “প্রকরণ” থেকে কফিল আহমেদ অনেক দূরবর্তী। বস্তুত জীবন ও শিল্পের সকল প্রকরণই কফিলের কাছে “সোনার রাজার মতোই কুৎসিত”। কেননা কফিল “সাতটা শঙ্খ একবারে” বাজাতে চান। কফিল আহমেদের গান তাই না গণসঙ্গীত, না আধুনিক, না লোকগীতি। কফিলের গান আসলে অগ্নিসঙ্গীত। দাহিকা বলাই সবচেয়ে ভালো হয়। কফিল আহমেদের গান হৃদয়ে দহনের সৃষ্টি করে। সে দহন রাজনীতি হোক কিংবা প্রেম! কফিল মানুষ এবং মানুষের জীবনের জটিলতায় অগ্নি প্রজ্বলন করেন। কাজে কাজেই ভদ্রলোকীয় তাল ঠুকতে ঠুকতে কফিলের গান শোনা অসম্ভব, ধারণ করা দুঃসাধ্য। কাজেই মসৃণ মানসে কিংবা মাধ্যমের ত্বকে কফিলের “বালিঘষা”(১) কণ্ঠ সহ্য করা সম্ভব হয়নি।
পাহাড় পোড়ানোর আকাঙ্খায় জনমানসে আগুন প্রজ্বলনের কাজে কফিল আহমেদ শুরু থেকেই নিঃসঙ্গ। এই ধারার সূচনা গৌতম ঘোষদের “মহীনের ঘোড়াগুলি” থেকেই সূচিত হয় বলা চলে। অনুসরণ করেছেন সুমন, নচিকেতারাও। তবে কফিল তাদের থেকে স্পষ্টভাবেই ভিন্ন। ‘সমাজতান্ত্রিক’ পশ্চিমবঙ্গে (ও কলকাতায়) যে নাগরিক চেতনা বিকশিত হয়েছে, বাংলাদেশে তা হয়নি একেবারেই। ২০১১ সালেও এই দেশে জলাধারের অধিকারের জন্য হাওড়ের জেলেদের লড়াই চলছেই। শহুরে নাগরিক এবং গ্রাম বা মফস্বলের শ্রমিক-কৃষক-জেলে এই উভয় জনমানসের আকাঙ্ক্ষার সুর একমাত্র কফিলই ধারণ করেছেন। বরং শহরের শিক্ষিত জনসমাজের চেয়ে কফিলের গান বেশি জনপ্রিয় হাওড়ের জেলে ও কৃষকদের কাছে। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যখন জানা যায়, তার প্রথম অ্যালবামের অর্ধেকেরও বেশি ক্যাসেট বিক্রি হয়েছে হাওড় অঞ্চলে কৃষকজেলেদের কাছে। সেই দিক বিবেচনায় সুমন, নচিকেতারা একেবারেই খণ্ডিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি।
সমকালের বাংলাদেশে এই ধারায় গান গেয়ে মাহমুদুজ্জামান বাবু, অর্ণব, অরূপ রাহী, কৃষ্ণকলি প্রমুখ কিছুটা খ্যাতিও পেয়েছেন। শুরুর দিকে এদের কারো কারো মধ্যে দাহিকাও দেখা গেছে। কেউ কেউ সমৃদ্ধ করেছেন এই ধরনের গানের ধারাকেও। বিশেষ করে বাবুর “হরেক রকম দিন কাটিলো” এবং রাহীর “কাকে তুমি প্রেম বলো, বলো ইতিহাস” তেমনই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আধুনিক গানের মসৃণ মাধ্যমে এদের অনেকেই মিশে গেছেন অবলীলায়। হারিয়ে গেছে গানের সেই দাহিকাও।
কিন্তু কফিল প্রজ্বলিত থেকেছেন। এবং নিঃসঙ্গও। শুধু তাই নয়, এই নিঃসঙ্গ যাত্রা থেকে কফিলকেও বিরত করে তাকে নিয়ে যেতে চান অনেকেই। এমনকি যিশুও। “যিশু আমার চন্দ্র হাতে পাতালপুরে যায়/ সে আমায় নিয়ে যেতে চায়”। কিন্তু কফিল তো যাওয়ার পাত্র নন। তার সাফ জবাব, “আমার চোখের সামনে পুড়ছে যখন মনসুন্দর গ্রাম/ আমি যাই নাই রে, আমি যেতে পারি না, আমি যাই না”।
এবং তারপর কফিল আহমেদ তার চোখের সামনের পোড়োগ্রামের সেই আগুনের “রূপকথাটা ছড়িয়ে” দিয়েছেন সবার “চোখের সামনে”। কিন্তু কেউ তা দেখে, কেউ দেখে না। যেমন প্রমিথিউসের করুণ পরিণতি দেখে হেফাস্টাসের মনে হয়, “সবকিছুই চোখের সামনে ছড়িয়ে রয়েছে, তবু কিছুই দেখতে পাই না”।
(চলবে)
Saturday, January 1, 2011
সুপ্রভাত ২০১১
বছরের শুরুর দিন যদিও পহেলা জানুয়ারি, কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবেই ৩১ ডিসেম্বর রাতটিই প্রধান উপজীব্য। কাজেই ৩১ তারিখ সকাল সকাল ঢাকায় পৌঁছুতে না পারলে সবকিছুই মাটি হয়ে যাবে ভেবে ৩০ তারিখ রাতেই ঠাকুরগাঁও থেকে বাসে উঠে বসলাম। হানিফ আমার পছন্দের তালিকায় একেবারে শেষের দিকে থাকলেও টিকেট জুটলো ওই হানিফেরই। এমনিই শীতের রাত, তার ওপর কুয়াশাও ছিল প্রচণ্ড। টাঙ্গাইলের কাছে এসে সামনের এক মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে দিল আমাদের গাড়ি। আমাদের গাড়িরও কিছু ক্ষতি হলো, আমি বসেছিলাম বি-১ নম্বর সীটে, কাজেই ধাক্কার কিছুটা জের আমার দেহে এসেও লাগলো। তবু ভাগ্য ভালো বলতেই হবে, কেননা আমি বাসেই ছিলাম, মাইক্রোবাসে না। দুর্ঘটনা ঘটলো এবং এরপর সেই শীতের কুয়াশাস্তীর্ণ রাতে ২/৩ ঘণ্টা রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে নতুন একটি গাড়ি আসার অপেক্ষা। কাজেই ঢাকা পৌঁছে নড়াচড়া করার মতো অবস্থাও আর আমার থাকলো না, থার্টি ফার্স্ট তো দূরের কথা।
কিন্তু এই দুর্ঘটনাটিকে আমি রেখেছি "ছোটোখাটো দুর্ঘটনাসমূহ"-এর তালিকায়। বড়ো দুর্ঘটনা বলতে বোঝাতে চাই যেদিন খুলনা থেকে মধ্য রাতে বৃষ্টির মধ্যে মাওয়া হয়ে ঢাকা আসছিলাম এবং পদ্মা পেরুনোর জন্য পুলিশ ইত্যাদিদের ঘুষ দিয়ে একটি স্পীড বোটে করে নদী পেরুলাম এবং যখন সেই স্পীড বোট মাঝনদীতে এসে নদীতে পোতা কোনো খুঁটির সাথে ধাক্কা লাগিয়ে প্রায় উল্টে যায় যায়...। এই দুর্ঘটনায়ও আমার কোনো ক্ষতি হয়নি, কিন্তু এই দুর্ঘটনা আমাকে দুর্ঘটনার ভয় বিষয়ে এক গভীর ধারণা দিয়েছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছি, জীবনেও আর স্পীড বোটে পদ্মা পাড় হবো না।
তবে সত্যিকারের শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন আমি হই দুটি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায়। এর একটি ঢাকা এবং একটি সাতক্ষীরায়। এই দুই দুর্ঘটনায় আমার হাত/পা-এ কিঞ্চিৎ রক্তপাত ঘটে, তবে হাড়গোড় ভাঙ্গেনি এটা বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি। এমনকি আমি মোটরারোহী না হয়েও বাসার সামনের রাস্তা পেরুতে গিয়ে মোটরের সামনে গিয়ে পড়বো, সেটিকে আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বিশেষ করে আমার সাথে তখন ল্যাপটপ, ক্যামেরা সহ নানা ধরনের সেনসিটিভ জিনিসপত্র ছিল। এবং মেনে নিতে পারছি না অফিসের কাচের দেয়াল কিভাবে আমি কার্টুন ছবির মতো ভেদ করে বেরিয়ে গেলাম! মানলাম, আমি খুব দ্রুত বেগে যাচ্ছিলাম এবং আমার দৃষ্টিও সামনের দিকে ছিল না, নিচে তাকিয়ে হাটছিলাম আমি। কিন্তু তাই বলে কাচ ভেদ করে কেন বেরুবো? কাচে ধাক্কা খাবো, মাথায় টাথায় ব্যথাট্যথা পাবো, কাচ ফেটেও যেতে পারে। টম এন্ড জেরির কার্টুন ছাড়া কাউকে কাচের দেয়াল ভেদ করে বের হবার কথা কেউ কি কোনোদিন শুনেছে? এই ঘটনাটিতেই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আমি। আমার সারা শরীরের প্রতিটি জায়গা অর্থাৎ হাত পা গলা পেট ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় কাচেরা জায়গা করে নিয়েছিলো, আমার খুবই পছন্দের শার্ট এবং প্যান্ট কেটেকুটে চিরতরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
এবং ৩১ ডিসেম্বরের ঘটনাটি তো আরো হাস্যকর। বাইজিদ ম্যাচ কোম্পানী-কুষ্টিয়ার "টু স্টার" নামে একটা দেয়াশলাই আছে, যেটি কার্বরাইজড করা হয়নি বলে আমার ধারণা, অথচ বেশি লাভের আশায় দোকানদাররা আজকাল সেটিই বেশি বিক্রি করে। সিগারেট ধরানোর জন্য যেই না আমি দেয়াশলাই বক্সে ঠুকেছি, ফট করে জ্বলন্ত বারুদ ছুটে আমার বাম চোখের ভেতর ঢুকে গেলো এবং বলা বাহুল্য, সেখানে চোখের আয়তনের অনুপাতে বড়োসড়ো এক গর্তের সৃষ্টি হলো- একেবারে ফায়ারহোল যাকে বলে। ২০১০ সালটি যদি আমার সাথে শত্রুতাই না করবে, তবে কেন এই হাস্যকর কিন্তু জঘন্য একটি দুর্ঘটনাটি দিয়ে আমাকে বছর শেষ করতে হবে?
Thursday, May 6, 2010
একবার তুমি সাহসে হাতের লাঠি তুলে ধরলেই, দেখবে আধাঁর কাটাবার বড়ো বেশি আর দেরি নেই
একটা ঘরের ভেতরে আমাকেসহ ৫/৬ জনকে আটকে রাখা হলো। বাইরে থেকে তালাবন্ধ। ভেতরে কোনো আলো নেই। দুপুরে কি খেয়েছিলাম, মনে নেই। এরপর ৩/৪ টা গোল্ডলীফ/নেভী/কেটুর ভাগ পেয়েছি। নিজের টাকায় সিগারেট কেনার মতো টাকাও তেমন ছিল না। রাতে খাওয়া হয়নি। যে ঘরে বন্দী আছি, সেখানে খাবার মতো পানিও নেই। বাথরুম? অকল্পনীয়! তবে বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে হবে না, সেটা জানি। ভোরের সূর্য ওঠার আগে যেভাবে দেয়াল বেয়ে এখানে এসেছি, সেভাবেই দেয়াল বেয়ে এই বন্দীশালার বাইরে চলে যেতে হবে। যেতে হবে মিছিলে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী প্রথম আন্দোলনের (১৯৯৮) সময়ের কথা বলছি। প্রতি রাতেই আন্দোলনকারী ছেলেদেরকে ছাত্রলীগের ধর্ষক গ্রুপ মারধোর করছে, এ কারণে নিজের হলে নিজের ঘরে যাওয়া আমাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব। বাপী ভাই এম এইচ হলের কয়েকটি ঘরের চাবি জোগাড় করে রেখেছিলেন, মূলত সেইসব ছেলেদের যারা আন্দোলনে সহিংসতার ভয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে গিয়েছিলো। হলে প্রবেশমুখে ছাত্রলীগের প্রহরা, তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে আমাদের নিজেদের ঘরগুলোতে এসে তল্লাশী চালিয়ে যায় তারা। ভাঙচুর-ও করেছে অনেক ঘর। আর তাই নিজের হলে নিজের ঘরে না গিয়ে এবং সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে, দেয়াল বেয়ে সেইসব নিরীহ ছাত্রদের ঘরে এসেছি আমরা। বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে রাখা হয় এবং ভেতরে আলো জ্বালানো হয় না। ছাত্রলীগ বাহিনী যাতে বুঝতে না পারে ভেতরে কয়েকজন আন্দোলনকারী অবস্থান করছে। দিনের আলো ফোটার আগে আবার এই পথেই ফিরে যেতে হবে। অবস্থানের সময় বলতে রাত ১২টা/১টা থেকে ভোর ৫টা/৬টা পর্যন্ত। ভোর থেকেই আবার মিছিল, আবার স্লোগান, আবার প্রশাসনিক ভবনের (রেজিস্ট্রার বিল্ডিং) সামনে অবস্থান। সকাল ৯ টার দিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আসেন, সিন্ডিকেট বসে, তদন্ত কমিটি বসে, বিচারশালিস নানা কিচ্ছাকাহিনী। এভাবে দীর্ঘ ২ মাস ধরে চলার পর, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রায়- অধিকাংশ অপরাধী খালাস, তদন্ত কমিটির সামনে সদাচারণের জন্য শাস্তি মওকুফ, বাকিদের ১/২ বছরের বহিষ্কারাদেশ ইত্যাদি। ধর্ষকদের পক্ষে আলাউদ্দীন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উৎসাহ তাদেরকে বেপরোয়া করে দেয়, ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে তারা ক্যাম্পাসে নারকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অবশেষে ২ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয় আইন নিজের হাতে তুলে নিতে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মিছিল করে প্রতিটি হলে গিয়ে ধর্ষকদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে। বরাবরের মতো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবারো ধর্ষকদের পক্ষ নেয়। তাদের এই পক্ষাবলম্বন এমন চরম মাত্রায় পৌঁছায় যে, ২০০০ সালে আন্দোলনের সময় তারা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
বরাবর ধর্ষক নিপীড়কের পক্ষেই প্রশাসনের অবস্থান থাকা সত্ত্বেও মানিক-তানভীর-মোস্তফারা টিকতে পারেনি। তার প্রধান কারণ জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের অদম্য সাহস এবং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ। এতোসব সত্ত্বেও কাফী এবং সানীর মতো দুই লম্পট ক্যাম্পাসে ক্ষমতাচর্চার মধ্য দিয়েই বেঁচে গেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই দুইজনের অসীম চামচামির গুণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষক সবসময় তাদের সমর্থন দিয়ে গেছেন। সেই সাথে রাজাকার-সান্নিধ্য তাদের টিকে থাকাটাকে আরো শক্তিশালী করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সামনে এই দুই শিক্ষক যেভাবে জুতোপেটার স্বীকার হয়েছেন, তার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতেই লজ্জা পাওয়ার কথা। কিন্তু মেরুদণ্ডহীন এবং দীর্ঘ জিহ্বার অধিকারী এই দুই শিক্ষক ক্ষমতাধরদের পদলেহন করে টিকে আছেন আজো। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগটি কিন্তু গোপন নয়, নিপীড়িতরা সবার সামনে এসে অভিযোগ করেছেন, বিচার চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের তদন্তের ফাইল হারিয়ে যায়, সাক্ষ্যপ্রমাণের কাগজপত্র গায়েব হয়ে যায়। নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলে থাকে। আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে ধর্ষক-নিপীড়কের পক্ষাবলম্বনের জন্য যতো ধরনের কৌশল করা যায়, তার সবই করে যাচ্ছে।
আমরা এই ঘটনায় আর কালক্ষেপন করতে আগ্রহী নই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা এবং তাদের সাথে একাত্ম অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজ জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার পাশাপাশি এই বিষয়ে নিজের নিজের অবস্থান থেকে এবং সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত ২৬ এপ্রিল মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত এক সম্মিলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজের বলয়ে এই বিষয়ে যথাসম্ভব কাজ করবেন। লেখকরা লিখবেন, সাংবাদিক প্রতিবেদন করবেন, অ্যাক্টিভিস্ট আন্দোলন চালিয়ে যাবেন, সংগঠকরা সংগঠিত করবেন, পেশাজীবীরা নিজ নিজ পেশার পরিমণ্ডলে প্রচারণা চালাবেন, আইনজীবীরা আইনী লড়াই করবেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
কাফীর বিরুদ্ধে যৌননিপীড়নের অভিযোগের ১২ বছর হতে চললো। আফসার আহমেদ এক যুগ ধরে খোঁজাখুঁজি করেও হারিয়ে যাওয়া ফাইলের হদিশ করতে পারলেন না। সানীর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে ৩ বছরের-ও বেশি সময় ধরে। প্রশাসন চলছে ঢিমেতেতালা মেজাজে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই এবার নাড়া দেওয়ার সময় এসে গেছে। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই কাজটি হতে পারে।
আমাদের প্রাণে প্রাণ মেলানো এবং প্রাণের বন্ধনীতে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আগামী ৩০ এপ্রিল ২০১০ শুক্রবার সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই বন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিটি মানুষকে আহ্বান জানাই, এই সংহতিতে অংশ নিন। (ভুলে যাওয়া) পুরনো মুখগুলোকে আবার দেখে নেয়ার, নিজেকে শানিয়ে নিয়ে নিপীড়নহীন স্বপ্ন পূরণের চেষ্টাকে আরো জোরালো করার এই বন্ধনীতে সবাইকে স্বাগত জানাই।
Monday, November 16, 2009
একটি জনজাদুঘরের সন্ধানে
প্যালেস্টাইনের জনজাদুঘর
প্যালেস্টাইনের জনজাদুঘর ১
প্যালেস্টাইনের জনজাদুঘর ২
দাতাসংস্থাগুলোর টাকায় বাংলাদেশে এনজিও-দের করা জনজাদুঘর বা গণজাদুঘর নামে বেশ কিছু জাদুঘর আছে। এমন কয়েকটি জাদুঘরের খোঁজ পেয়ে আমি সেগুলো দেখতে গিয়েছিলাম, প্রথম প্রথম যে অভিজ্ঞতাটি হতো তা হলো- জাদুঘর জিনিসটা যে উন্মুক্ত একটা ব্যাপার এই ধারণাও প্রতিষ্ঠাতাদের ছিল না। প্রায়শই আমাকে শুনতে হতো- এখন জাদুঘর খোলা যাবে না, অফিস থেকে অর্ডার দিলেই কেবল খোলা হবে। কবে সাধারণত খোলা হয় জাদুঘর? যখন বিদেশ থেকে কেউ আসেন।
এরপর থেকে যে এনজিও-র জাদুঘর দেখতে যাই, তাদের একজন কর্তাকে সাথে নিয়ে যাই। সে অভিজ্ঞতাও হতাশাব্যঞ্জক। প্রথমত, সংগৃহীত/উপস্থাপিত নিদর্শনের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ (কমন) হলো- ধান ও ধানচাষ সংশ্লিষ্ট কিছু জিনিসপত্র। এরপর থাকে যেগুলো তা হলো, কিছু গেরস্থালী জিনিস যা বিলুপ্তির পথে, শিলপাটা, ঢেঁকি, কাসার বাসনকোসন ইত্যাদি টাইপের জিনিসগুলো। তারপর এনজিও-টির কিছু প্রকাশনা- পোস্টার, লিফলেট, বইপত্র ইত্যাদি। আর কিছু যে থাকে না, তা না (দুএকটা ব্যতিক্রমী জাদুঘর আমাকে অবাক করে দিয়ে অফিস খোলা দিনগুলোতে খোলাই ছিল)। তবে মোটের ওপর এই ধরনেরই।
জনজাদুঘর করার জন্য জনগণের যে অংশগ্রহণ প্রয়োজন সেটি ওই জাদুঘরগুলোর বেশিরভাগের ক্ষেত্রে একেবারেই ছিল না। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো- জনজাদুঘর মানেই যে একটা উৎসব উৎসব ভাব, একটা প্রাণে প্রাণ মেলানোর ব্যাপার থাকে এইসব জাদুঘরে সেটি পুরোপুরি অনুপস্থিত।
একটি জনজাদুঘরের পরিকল্পনা আমরা করছিলাম গত ৪/৫ বছর ধরেই। সত্যিই আমরা জানি না, যেমন একটি জাদুঘরের স্বপ্ন আমরা দেখছি, তেমনটি করতে পারবো কিনা; তবে আমাদের দলের ছেলেমেয়েদের স্পৃহা অসীম। এই স্পৃহাই আমাদের নিরন্তর প্রেরণা জোগাচ্ছে একটি প্রাণবন্ত জাদুঘর প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে। খুঁটিনাটি পরিকল্পনা সব সেরে ফেলেছি, এমন নয়। তবে তো আর কোনো কথাই থাকতো না। ধান, পাট থাকবে আমাদের জাদুঘরে- হয়তো; তবে প্রাণের ঐকতানটাকেই আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি।
এই জাদুঘরটি আমরা জনসচেতনতার জন্য করতে চাই না; বিশ্বশান্তি- নিদেনপক্ষে ওই এলাকাটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও না; দেখো আমাদের কী সম্পদ আছে, এই অহমিকা তৈরির জন্যেও না। আমরা এটি করতে চাই, মানুষের শক্তি ও দুর্বলতা, মানুষের অর্জন ও অপরাধ, পরিবেশ ও ইতিহাসের সাথে মানুষের অভিযোজনশীলতা, মানুষের প্রকাশের আনন্দ ও অপ্রকাশের বেদনা- মোট কথা মানুষের অনুভূতিকেই অনুভব করার একটা জায়গা তৈরি করতে চাই। প্যালেস্টাইনের জনজাদুঘরটিতে এক বৃদ্ধ নারী তার উদ্বাস্তু জীবনের গল্প শোনাচ্ছিলেন অন্যদেরকে। প্যালেস্টাইনের মানুষের কাছে উদ্বাস্তু জীবনের গল্প? মা-র কাছে মামাবাড়ির গল্পের মতোই ব্যাপার! তবু কিশোরকিশোরীরা তো বটেই, ওই উদ্বাস্তু নারীর অনেক সহযাত্রীও বার বার তার গল্প শুনে আপ্লুত হয়েছেন, আয়নাতে যেন নিজেকেই বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিচ্ছিলেন। (মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে “মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনো” প্রকল্পটি তাই এতো জনপ্রিয় হয়েছিল)
জাদুঘরের কাজ আসলে খুব কঠিন। বিশেষ করে টাকাপয়সার কথা ভেবে ব্যাপারটা আমাদের কাছে এক সময় খুব অসম্ভব বলেই মনে হয়েছিলো। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপার আমাদেরকে বার বার আমাদের স্বপ্নের কাছে ফিরিয়ে আনে। টিমমেটদের স্পৃহা-টা তো আছেই, বাইরের কিছু প্রভাব-ও আছে। শিল্পকলা একডেমীর কনজারভেশন ল্যাবরেটরিতে যখন কাজ করতাম, অফিস সহকারী মীজান ভাই করতেন আমাদের দশগুণ কাজ। অফিসে বসে ফাইলপত্র নাড়াচাড়া করলেই তার চলতো, কিন্তু কিছু লোক আছেন যারা আরেকটু বেশি কিছু করেন, তিনি তেমন-ই একজন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও, অনেক কাজেই তিনি এখনও আমাদের একমাত্র ভরসাস্থল। জনজাদুঘরের জন্য নগর থেকে কিছুটা দূরে কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটামুটি ভালো এমন একটা জায়গা খুঁজছিলাম আমরা। মীজানুর রহমান আমাদের সেই সমাধান দিয়েছেন, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় পূর্ণিমাগাতীতে পাঁকা রাস্তার ধারে তার ৮ শতাংশ জমি এই জাদুঘরের জন্য দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাই আমাদের জানিয়েছেন, আমরা যদি সত্যিই জাদুঘরের কাজ শুরু করি, তাহলে তিনি তার অংশের ৮ শতাংশ জমিও দান করবেন।
মীজান ভাইয়ের জমি আর আমাদের স্বেচ্ছাশ্রমের সঙ্গে এবার আপনার একটু সাহায্য চাই; এখনও জাদুঘরের নামে কোনো একাউন্ট আমরা খুলিনি, সুতরাং টাকাপয়সা চাচ্ছি না (ভবিষ্যতে লাগলে জানাবো); যা চাচ্ছি তা হলো পরামর্শ। অনেকেই আছেন যারা দেশবিদেশের অনেক জাদুঘরেই গেছেন এবং/অথবা জানাশোনা/পড়াশোনাও অনেকের অনেক ভালো। সুতরাং আপনার মতামত খুবই কার্যকরী হতে পারে এই জনজাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে।
আর একটা অনুরোধ-ও এর পাশাপাশি করি। তা হলো- আপনাদের কারো কাছে যদি “পুরনো দিনের আবর্জনা” ধরনের জিনিস কিছু থাকে, বাপদাদার আমলের লোটাবদনা, ঘড়ি-ছড়ি, পুরনো বইপত্র, যা-ই হোক, যা ভাগাড়ে ফেলে রেখেছেন, ঝেটিয়ে বিদেয় করতে চান তাড়াতাড়ি, আমাদের খবর দিন। আমরা আপনার কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করবো।
Sunday, November 15, 2009
বালিয়া মসজিদ সংরক্ষণ : গুইসাপ


এই ছবিগুলো আজ (২ নভেম্বর ২০০৯) দুপুরে তোলা, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া মসজিদের সংরক্ষণ কাজ করতে করতে আমরা যেসব প্রাণীকুলের দেখা পেয়েছি, তার মধ্যে উনাদের জ্ঞাতি-স্বজনরাও ছিলেন। আমরা উনাদেরকে নিকটস্থ কবরস্থানে পুনর্বাসনের জন্য চেষ্টা করেছি। এই পুনর্বাসন প্রকল্পের (!) বিরোধিতাকারী কিছু দখলবাজ পুঁজিবাদী অথবা সকল সম্পত্তিতেই সকলের অধিকার আছে এমন কম্যুনিস্ট অথবা তোমাদের সম্পত্তিতে আছে অসহায়দের অধিকার এমন আয়াতের ভুল ব্যাখ্যাকারী মৌলবাদী অথবা জানিনা কোন্ মতবাদে বিশ্বাস এমন- যাই হোক, উনি আমাদের কথা রাখলেন না, উনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। বাংলার ঐতিহ্য যে ভবন সেই ভবন দখল আর বাংলার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কোনো না কোনো অর্থে তো সমান হতেও পারে। বিস্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে আমরা যেসব লুকায়িত হানাদার বাহিনীকে পাকড়াও করতে সক্ষম হয়েছি, তাদের মধ্যে আজকের উনিও একজন।
উনার গ্রেফতারের কাহিনী সাদ্দামের গ্রেফতারের কাহিনীর মতোই রোমাঞ্চকর। একটি হন্তারক ব্যাঙ পথ হারিয়ে আমাদের ভবন-অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে, তার বিশাল বপু নিয়ে সে বেশি লাফাতেও পারছিল না, ইতোমধ্যে যে দু'চারটি ঘাসফড়িং হত্যা করে এসেছে, এটা তার ঠোটে লেগে থাকা ঘাসফড়িংয়ের রক্ত দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। কিন্তু বাবার-ও বাবা আছে, দাদার-ও দাদা। যেই না এই খুনি ব্যাঙ আমাদের ভবনে প্রবেশ করে, তৎক্ষনাৎ প্রায় শূন্যে ঝাপিয়ে পড়ে তাকে দখল করে বক্ষমান গুইসাপ। প্রথম ছবিটিতে গুইসাপের পাশে যে মৃত ব্যাঙটিকে দেখতে পাচ্ছেন, সেটিই ছিল ওই হতভাগা ব্যাঙ। এই অতি লোভাতুর হত্যাকাণ্ডের কারণেই আজ গুইসাপের এই পরিণতি। আমাদের সংরক্ষণ কাজের একজন শ্রমিক ছিল এই হত্যার রাজসাক্ষী। নিধিরাম সর্দার হিসেবে অচিরেই এই শোক সংবাদ আমি পাই এবং ক্যামেরা নামক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে তাকে অচিরেই তাকে পিছু হটতে বাধ্য করি এবং কবরস্থানে প্রেরণ করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হিজরতকালে তিনি ব্যাঙটি ফেলে যান। এখানে উল্লেখ্য যে, মান দেবো তবু জান দেবো না নীতিতে বিশ্বাসী এই বর্বর গুইসাপটি সদর পথে প্রস্থান না করে ছাদ বেয়ে পেছনের পথে প্রস্থান করে। দ্বিতীয় ছবিতে তার সেই প্রস্থানের চিত্রই প্রস্ফুটিত হয়েছে।জাতের নামে বজ্জাতি সব
আমি শুনেছি ইউরোপ-আমেরিকায় অনেকে নাকি এখনো বাংলাদেশ-কে পাকিস্তানের অংশ মনে করেন, কেউ কেউ ভারতের একটা প্রদেশ-ও ভাবেন। বাংলাদেশের মানুষকে অবলীলায় ইন্ডিয়ান বা অন্য কোনো জাতীয় হিসেবে চালিয়ে দেন। কিংবা অনেক বাংলাদেশিও নিজেকে বাংলাদেশি না বলে প্রথম পরিচয়টা ইন্ডিয়ান বা এই ধরনের কিছু বলেন। আর মুসলিম? ‘দুইপাতা ইংরেজিপড়া' মুসলমানদের অনেকেই ইসলামী রীতি তো দূরের কথা পারলে বাংলার ইতিহাস থেকে মুসলিম শাসনের ৭০০ বছর-ও মুছে দিতে চান।
অবস্থা কতোটা ঘোরতর বুঝবেন, যখন সরকারপ্রধান '৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তনকেই এইদেশের উন্নয়নের জন্য জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন দেখুন প্রথম আলোর সংবাদ। ব্যক্তিগতভাবে আমি '৭২-এর সংবিধান পছন্দ করি না, তবে আমার পছন্দ করার চেয়েও অনেক বেশি করে সেটি পছন্দ করেন না এই দেশের অবাঙালিরা। কারণ এখানে জাতীয়তাবাদ বলতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়েছে, মহান নেতা বলেছেন- তোমরা সব বাঙালি হ'য়া যাও। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ইসলামিয়া কলেজের নাম বদলে হবে নজরুল কলেজ কিন্তু নটরডেম, হলিক্রস, রামকৃষ্ণ কলেজের নাম থাকবে যেমনছিলতেমন। যেন বাঙালিত্বেই সব জাতীয়তাবাদ, যেন অনৈসলামেই সব ধর্মনিরপেক্ষতা।
জাতীয়তা আসলে কি? সমাজবিজ্ঞান এমন এক অদ্ভুত বিজ্ঞান যা কোনো কিছুর স্থির ব্যাখ্যা দিতে পারে না। জাতীয়তার ধারণা এমনভাবে বদলে গেছে বিভিন্ন সময়ে, এক সময়ের ধারণা অন্য সময় প্রায় উল্টো। তিনটি সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারণার কথা আমরা বলি প্রায়ই- একটা হলো মৌলবাদী, আরেকটা যন্ত্রবাদী আর তৃতীয়টা নির্মাণবাদী। মৌলবাদী ধারণাটা এখন সমাজবিজ্ঞানে সবচেয়ে অচল, কিন্তু ওইটাই আমরা সবচেয়ে বেশি বলি। আমার বাপ-দাদা যেই জাত আছিলো, আমি কি সেই জাত না? আমি কি এই দেশের আদিবাসী না? মণিপুরীরা তো আইছে বিদেশ থেকে, আমার দাদা-পরদাদারা এই দ্যাশের আসল আদিবাসী ইত্যাদি ইত্যাদি এটিই মৌলবাদী ধারণা। অর্থাৎ প্রধানত রক্তের সম্পর্ককে ভিত্তি করে যে জাতীয়তাবাদী ধারণা গড়ে উঠেছে, সেটিই হলো মৌলবাদী জাতীয়তাবাদ। অনেকে একে মূলবাদী, অনেকে প্রাথমিকবাদী অনেকে আদ্যবাদী বা আদিবাদী ইত্যাদি ভাবে বঙ্গায়ন করেছেন। এই তত্ত্বে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো- বংশগরিমা। প্রথমে সৈয়দ পরিবার সেরা, পরে সৈয়দ বংশ সেরা, পরে সৈয়দপুরবাসী সেরা, পরে সৈয়দস্তান-এর মানুষ পৃথিবীর সেরা জাতি, তারপর সৈয়দদের গায়ের রঙ যেহেতু কমলা, সুতরাং পৃথিবীর সকল কমলা মানুষ-ই সেরা, এইভাবে এটা একটা পুরা রেসিস্ট জাতীয়তাবাদে পরিণত হয়। ব্রিটিশদের হাতে রোপিত হলেও জার্মানদের হাতে এই বৃক্ষ ফুলে ফলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। গুস্তাফ কোসিনা এই ক্ষেতের মূল চাষী; হাইনরিখ হিমলার এবং আলফ্রেড রোজেনবার্গ কিছুটা কামলা দিছে।
যন্ত্রবাদী ধারণাটি হলো জাতীয়তা নির্ণয়ের একটা যন্ত্র নির্ধারণ। অর্থাৎ স্বাতন্ত্রসূচক একটা উপাদান (যন্ত্র) খুঁজে বের করে ওইটার সাপেক্ষে জাতীয়তাবাদ নির্ণয়। ওরা যেহেতু বাংলায় কথা বলে সুতরাং ওরা সব বাঙালি, ওরা যেহেতু সব বাইবেল পড়ে সুতরাং ওরা খ্রিস্টান জাতি, ওরা যেহেতু সব লাল পুঁতির মালা পরে সুতরাং ওরা সব লালমালা* জাতি। এইভাবে একটা কিছু খুঁজে বের করে ঐক্য তৈরি করা। কাঠামোবাদী, উপযোগিতাবাদী ইত্যাদি নানা নামে একে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে নামের সাথে মিলিয়ে সংজ্ঞার সামান্য হেরফের আছে, মূল ঘটনা এক-ই। যাই হোক এই সংজ্ঞাও কার্যত অকার্যকর। কারণ দেখা গেছে, একই ভাষায় কথা বললেও ইংরাজগুলা মোটেই এক জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চায় না। অথবা এক ধর্ম হইলেও মুসলমানগুলা সব ফাঁক পাইলেই স্বাধীন হইয়া যায়। এইসব নানা কিসসা কাহিনী দেইখা সমাজবিজ্ঞানীরা কইলো, না থাউক, এইভাবে হইবো না, অন্য রাস্তা দেখি।
নির্মাণবাদীরা এইবার ধরলো ব্যক্তিকে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি কিভাবে সর্বব্যাপী ও সাধারণ ব্যক্তি হয়, তার চেষ্টা। দৈহিক গড়ন, নাম, ভাষা, ইতিহাস, ধর্ম ইত্যাদি নানা ধরনের যাতাকলে পিষ্ট করে এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সাথে কোথায় সবচেয়ে বেশি খাপ খায় সেই বিষয় জানার চেষ্টা করে। এইভাবে ব্যক্তির বিভিন্ন চর্চা, সংস্কৃতি, পরিপ্রেক্ষিত, ইতিহাস ইত্যাদির আলোকে একই সমাজে নানা স্তরায়ন করে জাতীয়তাকে ভাঁজে ভাঁজে সাজাইলো। এর ফলে বাঙালি হিন্দু, বাঙালি মুসলামান, বাংলাদেশি বাঙালি, ভারতীয় বাঙালি, বাংলাদেশি মুসলমান বাঙালি, বাংলাদেশি হিন্দু বাঙালি, বাংলাদেশি নিম্নবর্গের মুসলমান বাঙালি ইত্যাদি নানা ভাবে জাতীয়তাকে চিহ্নায়নের চেষ্টা করে। এর থেকে ‘তোমার দেশ কই?- নোয়াখালী, তোমার জাত কি?- জাইল্যা' এইটা অনেক বেশি যুৎসই মনে কইরা, সমাজবিজ্ঞানীরা কি করি কি করি একটা ধান্দায় পড়ে গেল।
(চলবে)
*লালমালা জাতি নামে আসলেই একটা জাতি চিহ্নিত করা হয়েছিল।
৭৭২ কিস্তির মেগা উপন্যাস : সপ্তম কিস্তি
ডেন্টাল ভাস্করের প্রকৃত নাম ভাস্কর নিবেদন। লাল সালু আন্দোলনের নিবেদিত কর্মী বলে তার নাম ভাস্কর নিবেদন, নাকি তিনি নিবেদন শব্দটি বেশি উচ্চারণ করেন বলে এই নাম, নাকি এটি তার মাতৃপিতৃপ্রদত্ত নাম, তার কিছুই আমি জানি না। ক্যাম্পাসে আসার পর আমি জেনেছি, তিনি চলে যাচ্ছেন। মানে তার পড়ালেখা শেষ, সুতরাং কয়েকবছরের মধ্যেই তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করবেন। একজন বিদায়ী কমরেডের নাম-রহস্য উদ্ঘাটন না করে বরং তার কাছ থেকে তার মহোত্তম গুণাবলি অর্জনের চেষ্টাই অধিকতর ফলদায়ী বলে চলমান কমরেডরা পরামর্শ দিলেন।
তার গুণ-রহস্য জানার চেষ্টায় প্রথমেই জানতে পারলাম, তিনি এক মহান দন্ত-বিশারদ। টুথপেস্ট এবং ব্রাশ এ দুটি পণ্য পুঁজিবাদের ধারক ও বাহক বলে তিনি এই সমস্ত ব্যবহার করেন না। মার্কস ও এঙ্গেলসের মন্ত্রণাগ্রন্থসমূহে দন্তের কোনো মন্ত্র না থাকায় প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব জ্ঞানের ব্যবহারের মাধ্যমেই দন্ত-যত্ন-সমস্যার সমাধান করতে হবে, এটিই ছিল তার মত। প্রকৃতির অন্য সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ দাঁতের যত্নে যে পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে, মানুষকেও সেই পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিই গ্রহণ করতে হবে।
পরে অবশ্য আমি জেনেছি, শেষ দিকে ভাস্কর নিবেদন-এর অপর দু’একটি নাম অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়, সেগুলো হলো ফোম ভাস্কর, বাবল ভাস্কর ইত্যাদি। কেননা শোনা যায়, বুদবুদ বা ফেনোদ্গম করে (যেমন- টুথপেস্ট, সাবান, শ্যাম্পু ইত্যাদি) এমন সকল পুঁজিবাদী পণ্যের বিরুদ্ধেই নাকি তিনি জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন।
শঙ্কু ও শমী বিষয়ক রুদ্ধদ্বার বাহাস যখন ভেতরে চলছিল, হঠাৎ দরোজায় বিকট শব্দে লাথি-ঘুষির শব্দে আমরা চমকিত হলাম। শত্রুলীগ বা শত্রুদলের কে এই অকস্মাৎ আক্রমণ করলো- এই বিষয় নিয়ে কমরেড ন্যান্সি এবং কমরেড পত্তর-এর মধ্যে কিছুটা বিবাদের পর কমরেড মাসুমবাচ্চা দরজা খুলে দেওয়াই শিশুসুলভ কাজ হবে বলে রায় দিলেন। যে কোনো ব্যাপারে শিশুরাই সবচেয়ে যথার্থ সিদ্ধান্ত দিতে পারে বলে কমরেড মাসুমবাচ্চা মনে করেন। তবে বাচ্চা শব্দটি শিশুবান্ধব হয় না বিধায়, কমরেড বাচ্চু বলে তার বিশেষ খ্যাতি ছিল।
এবং ডেন্টাল ভাস্কর। দরজায় দাঁড়িয়েই তিনি নিবেদন করলেন- ‘বিভিন্ন মহল থেকে এই ঘটনা সম্পর্কে যেসব তথ্য আমার কাছে নিবেদিত হয়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে, এই বিষয়ে আমার কিছু নিবেদন রাখা দরকার’। তিনি আরও নিবেদন করলেন- যেহেতু উভয় কমরেড দৃষ্টিপাত শাস্ত্রের শিক্ষার্থী এবং তিনি নিজেও দৃষ্টিপাত বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সুতরাং এই সমস্যায় তার দৃষ্টি নিবেদন অত্যন্ত জরুরি।
দরজার কাছাকাছি কেদারাসমূহে যেসব কমরেডরা বসেছিলেন, তারা সমস্বরে হাঁচতে হাঁচতে দ্রুত কমরেড নিবেদন-এর জন্য আসন ছেড়ে দিলেন এবং নিজেরা একযোগে দূরবর্তী কমরেড কুদ্দুসের পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন। বিষয়টি অস্বস্তিকর দেখালেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এর কোনো বিকল্প ছিল বলে আমার মনে হয় না।
কুদ্দুস পুনরায় মুখ খুললেন- হ্যা শঙ্কু, তুমি বলো- পত্তর অথবা ন্যান্সির সাথে কালুভবনের সামনে বসে না থাকে, কেন তুমি শমীর সাথে বসে থাকো?
কমরেড পত্তর বললেন- এই বিষয়ে শঙ্কুকে একটি কারণদর্শানোর চিঠি দেওয়া হোক।
কুদ্দুস বলেই চললেন- বুঝলাম, তোমরা উভয়েই কালু অনুষদের শিক্ষার্থী, উভয়েই দৃষ্টিপাত বিভাগে একই বর্ষে পড়ো, কিন্তু তাই বলে কালুভবনের সামনে কেন তোমরা একসাথে বসে থাকবা? লাল সালু আন্দোলনে ব্যক্তিবাদের কোনো জায়গা নাই, তোমার যদি কোনো বিশেষ বোধ জাগে, সেই বোধ তুমি ন্যান্সির সাথে আলাপ করো, পত্তরের সাথে আলাপ করো। একটি অষ্টাদশী শিশুর সাথে তোমার আলাপের রহস্য কি? এটি তো শিশু নির্যাতনের সামিল।
পত্তর বললেন- শিশু নির্যাতন বিষয়ে শঙ্কুকে কারণ দর্শানোর জন্য একটি চিঠি দেয়া যেতে পারে।
বাচ্চু এই পর্যায়ে বললেন- এটিকে আপনারা শিশু নির্যাতন না বলে, শিশুদের সাথে সখ্য-ও বলতে পারেন, এবং তাতে আমি তো দোষের কিছু দেখি না।
নূরুল কুদ্দুস হুংকার দিয়ে উঠলেন- কারো ব্যক্তিগত দেখা না দেখা দিয়ে তো আর লালখাতা বাধাই হয়নি। কোটি কোটি বছর ধরে মানুষ তিলে তিলে যে স্বপ্ন দেখেছে, সেই স্বপ্নের দেনাপাওনার হিসেবনিকেশ ওই খাতায়। কোটি কোটি বছর ধরে নির্মিত সেই লালখাতার আমরা ধারক ও বাহক। ব্যক্তিগত ভাললাগা, মন্দলাগা, স্বপ্ন, আকাঙ্খা এইসব পুঁজিবাদী চিন্তা থেকে আমাদেরকে কোটি কোটি হাত দূরে থাকতে হবে। তুমি একজন মহারাজ হয়ে এমন মহাপাপ করতে পারলে কিভাবে?
এতোক্ষণে আমার বোধোদয় ঘটলো, শঙ্কুর পুরো নাম তো শঙ্কু মহারাজ। তবে কি একদা তিনি অন্য কোনো রাজ্যের রাজা ছিলেন? তাই কি এতো প্রশ্ন? আমাদের রাজ্যে এসেছেন আমাদের রাজকন্যা হরণ করতে? কমরেড কুদ্দুস কতকটা তেমনই ইঙ্গিত দিলেন। এরপর তিনি একে একে বলতে লাগলেন, কি কি পাপাচার তারা করেছে। এক সাথে এক বাসে করে সুদূর ঢাকা পর্যন্ত তারা ভ্রমণ করেছে এবং এই দীর্ঘ ৬* ঘণ্টার ভ্রমণে তারা পাশাপাশি সীটেও হয়তো বসেছে। এবং এটি কি ইঙ্গিত বহন করে? কমরেড চীৎকার করে জানতে চাইলেন- আদিম বিকৃতির প্রকাশ নয় এটা?
পটকা ফাটানোর মতো চীৎকার শুনে ভয়ে, নাকি কথা শুনে লজ্জায়, কেন জানি না এই পর্যায়ে শমী ভ্যা ভ্যা করে কান্না শুরু করে দিল।
*১৯৯৭-৯৯ সালে আরিচা রোড সংস্কারের কারণে ঢাকায় যেতে প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগতো।
*** বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই উপন্যাসের ৭ম/৮ম পর্বগুলো সচলে খসড়া আকারে লিখে রেখেছিলাম, আমার নিজের ভুলে না সচলের ভুলে জানিনা, সেগুলো ডিলিট হয়ে গেছে; নতুন করে লেখার কোনো আগ্রহই পাচ্ছিলাম না। ঠাকুরগাঁওয়ে এই মুহূর্তে আমি একটু বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছি, অন্যরা কাজ করছে; কিন্তু আমি অসুস্থতার ভাণ করে কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি। আর সকলেই তো জানেন- অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।
রাজকুমার মুরগির বাচ্চা হতে চেয়েছিল
বখতিয়ার খলজি (আসলে ইখতিয়ার খিলজি)-র ‘বঙ্গবিজয়’ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল মিনহাজ-ই-সিরাজ রচিত তাবকাত-ই-নাসিরি; এই গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক বলছেন- ‘এই গ্রন্থের তথ্যসমূহ একেবার নির্ভুল, অকাট্য ও প্রামাণ্য, কেননা এখানে সরাসরি সেই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যিনি এই কাহিনী শুনেছেন তার নানার কাছে এবং তার নানা এটি শুনেছেন সেই ব্যক্তির কাছে, যার সাথে দেখা হয়েছিল এমন এক ব্যক্তির যিনি বখতিয়ার খলজির কোনো এক অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন’। এতোই প্রামাণ্য সেই ইতিহাস!
রাজকুমারের সোনালী রঙের চামড়ার ব্যাগটার ভেতর কী কী জিনিস আছে, তা নিয়ে আমার জানা বৃত্তান্ত অনেকটা তাবকাত-ই-নাসিরির মতোই, পরম্পরায় শুনেছি ওই ব্যাগের ভেতর নাকি রাজকুমার সাপ পুষতেন, প্রয়োজনের সময় সাপের বিষ জিবের ডগায় নেয়ার জরুরত ছিল। রাজকুমার নিজেও ওই ব্যাগের সাবধানতা বিষয়ে যারপরনাই সচেতন ছিলেন। আমি একবার কি একটা জিনিস খুঁজতে কাছে গিয়ে ওই ব্যাগ ছোঁয়ামাত্র রাজকুমার তেড়ে আসলেন, ব্যাগের ভিতরে কি আছে না জেনে ব্যাগ খুলতে যাস কোন্ সাহসে? ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং তারপর বৃত্তান্ত শুনে সন্তর্পণে ব্যাগের এক কোণা খুলে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে আরো সন্তর্পণে জিনিসটা বের করে আনলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর মনে হবে, সত্যিই হয়তো ব্যাগের ভেতরে সাপখোপ আছে, না হলে এতো সাবধানতার কারণ কী? আমার সন্দিগ্ধ মন অবশ্য বলে, প্রায় দুই দশক ধরে ব্যবহারের কারণে ব্যাগের চেইনের অবস্থা ছিল শোচনীয়, ফলে একবার খোলা হলে তা লাগাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় বলে রাজকুমার যারপরনাই সতর্কতার সাথে ব্যাগের চেইন খোলা-লাগানোর কাজ করতেন এবং অন্য কাউকে ব্যাগ খুলতে দিতেন না। এবং সেই সাথে ফুটনোট দিয়ে দিচ্ছি, রাজকুমার সম্পর্কে যদি কেউ কখনোও কোনো অভিযোগ আনেও রাজকুমার অলস ছিল, এই অভিযোগ কেউ আনতে পারবে না। ফলে আলস্যের কারণে ব্যাগের চেইন বদলানো হয়নি, ব্যাপারটা তা না। আসলে ব্যাগের চেইন সারানোর মতো ১৫ টি টাকা হয়তো রাজকুমারের হাতে কখনো আসেনি। যদি আসতোও তা দিয়ে যে সে কি করতো তা খোদাই মালুম, কেননা মাত্র ১ টাকা পকেটে নিয়ে এই লোক ঢাকা থেকে ইন্ডিয়া ভ্রমণ করে এসেছেন। সেই গল্পেই যাচ্ছি।
রাজকুমার আর আমি ছাড়াও তখন আমাদের বাড়িতে গরু, ছাগল, বাঞ্ছিত কুকুর ও অবাঞ্ছিত বিড়াল, কবুতর এবং হাঁসের পাশাপাশি একগাদা মোরগ-মুরগিও ছিল। বাড়িতে ডিম খাওয়ার মানুষ নেই দেখে সেই ডিম ফুটে ফুটে বাচ্চা হতে হতে মুরগির পাল-ও হয়েছিল বিশাল। একটা মোরগ তো আমার ঘরেই থাকতো, প্রতিদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেত এবং সন্ধ্যা হলে গৃহপ্রবেশ। মজার ব্যাপার ছিল, ওই মোরগটা কখনও আমার ঘর নোংরা করেনি, লক্ষ্মী ছেলের মতো বসবাস করতো। (এই গল্প পরে অন্য একদিন বলবো)
রাজকুমার আমাকে বললেন, জন্মান্তর হলে মুরগির বাচ্চা হবো রে!
-বাচ্চা? কিন্তু বাচ্চা তো চিলে নিয়ে যায়।
-আরে, মা আছে কি করতে? চিল তো চিল, স্বয়ং ***** আসলেও...। বাচ্চা নেওয়ার সময় মুরগির রি-অ্যাকশন দেখছিস?
-রি-অ্যাকশন দেখে কি হবে? বাচ্চা যদি নিয়েই যায়?
-আরে, সবসময় মুরগির পাখনার নিচে লুকিয়ে থাকবো রে!
-কিন্তু বড়ো তো হয়ে যাবা, রাজকুমারদা!
-আরে না, বড়ো হবো ক্যান্? বাচ্চা হয়েই থাকবো। ভগবানের যদি জন্মান্তর-দানের ক্ষমতা থাকে, চিরকাল তবে বড়ো হতে না দেওয়ার ক্ষমতা-ও থাকা উচিৎ।
বাবরি মসজিদ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডকারখানার পর রাজকুমার পরিবার ভিটেমাটি ও চাষাবাদের জমিজমা বিক্রি করে মামার দেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিলো, দেশমাতা নাকি জন্মদাত্রী মা এই বিতর্ক রাজকুমারের মনে এসেছিলো কিনা জানিনা, তবে তরুণ রাজকুমার তখন বাবা-মা-পরিবার-আত্মীয়পরিজনের সঙ্গে ইন্ডিয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এবং সেই থেকে বাংলাদেশে ভূমিহীন, পরিবারহীন এক সংখ্যালঘু পরিণত হলেন।
কিন্তু প্রায়ই রাতের বেলা রাজকুমার হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে মা বলে চেচিয়ে দেশমাতৃকা না মা দুর্গা না জন্মদাত্রী মাতা, কার কথা ভাবতেন এটা বোঝা দুঃসাধ্য ছিল। মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি বলে, পকেটে এক টাকার একটা কয়েন নিয়ে একদিন শাহবাগ থেকে রওনা হলেন রাজকুমার। অনেকেই হয়তো জানেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ঢাকা থেকে জাহাঙ্গীরনগর আসতে বাসভাড়া লাগে এক টাকা। ভক্ত-বন্ধুদের খাতিরে পকেটের এক টাকা পকেটে রেখেই রাজকুমার ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছুলো এবং তারপর শুরু করলো মানিকগঞ্জ যাবার ভাড়ার জন্য ঘ্যানঘ্যান, বেশি না মাত্র ১০ টাকা হলেই শুভ যাত্রা বা নবীনবরণে মানিকগঞ্জ যেতে পারে। জন্মভূমিতে শৈশবের বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে আরো ১০-১৫ টাকা ম্যানেজ করে আরিচা ঘাট, পদ্মা পেরুলেই রাজবাড়িতে আত্মীয়ঘর। সেখান থেকে কিছু জোগাড় করে কোনো মতে ঝিনেদায় গোলাম রসুলের কাছে যেতে পারলেই সে-ই বেনাপোল হয়ে বর্ডার পাড় হওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। অদূরপ্রসারী পরিকল্পনা উপস্থাপনের কৌশলে শামীম, বিশ্বসহ কতিপয় ভক্তঅনুরাগী তার সাথে আরিচা ঘাট পর্যন্ত রওনা হলো; একটা ভ্রমণ-ও হলো, রাজকুমারেরও একটা গতি হলো। আরিচা ঘাটে রাতের আড্ডা সেরে শামীমরা ক্যাম্পাসে আর রাজকুমার পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে মায়ের দর্শনে চললো। আমরা শুনেছি, বর্ডারের গ্রামগুলোতে তাকে ২-৩ দিন থাকতে হয়েছিল এবং কোনো কোনো সময় তাকে একটানা ২৪ ঘণ্টাও হাটতে হয়েছিল। এবং প্রথমবার মামাবাড়ি গিয়ে সে দূরে দাঁড়িয়ে তার মায়ের কাছে খবর পাঠায়- রাজকুমার এসেছে। দেশত্যাগের সিদ্ধান্তের কারণে বাবার প্রতি যে ক্ষোভ ছিল তার, তা প্রথমবার ভারতভ্রমণে প্রকাশ করে রাজকু বাবার সঙ্গে দেখা না করে। মায়ের সাথে ১ ঘণ্টার মতো দেখা করে আবার যে পথে গমন ওই পথেই প্রত্যাবর্তন করে ক্যাম্পাসে। গোলাম রসুল তাকে ব্যাপক সাহায্য করেছে বলে শুনেছি। তবে, এই রীতিতে ভারতভ্রমণের ক্ষেত্রে এরপর সে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করে, এমনকি পকেটে কোনো টাকা না থাকলেও তার পক্ষে ইন্ডিয়া গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসাটা পানির মতো সহজ কর্ম হয়ে দাঁড়ায়। তবে সর্বশেষ ইন্ডিয়া গমন তার দীর্ঘস্থায়ী, সবুজ বাঘের ভাষায় “পরচিম বঙ্গের ডুয়ার্সের চাবাগানে হে নাকি আমোদেই আছে। কুলি কামিনগো নগে চা পাতা ছিড়ে আর মদ গাঞ্জা খাইয়া সাধুর নগাল পইড়া থাকে”।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি, তুমি কি শেষ পর্যন্ত মুরগির বাচ্চা হতে পারলে রাজকুমারদা?
আব্দুল করিমের হাড়গুলো কোথায়?
"আমি মরলে আমার হাড়গুলি নিয়েও বাণিজ্য হবে"- বলেছিলেন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। ২০০৩ এর ১৬ অক্টোবর প্রথমালোতে সেটি ছাপা হয়। এবং মর্মান্তিক হলেও সত্যি, প্রথমালো এই মহান শিল্পীকে যথেষ্ট অত্যাচার করেছে। মারা যাবার কিছুদিন আগেও ভয়াবহ অসুস্থ এই শিল্পীকে তারা বন্ধুসভার মতো একটা চতুর্থশ্রেণীর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এনে হাজির করেছে এবং অসুস্থ শিল্পীকে গান গাইতে বাধ্য করেছে। এই জঘন্য কীর্তিকে আবার তারা তাদের কাগজে মহান কর্ম হিসেবে ফলাও করে ছাপিয়েছেও।
প্রথমালোই শুধু নয়, আমরা যারা শিল্প-সংস্কৃতির সেবায় জান লড়িয়ে দিচ্ছি, আমরাই বা কম কিসে? গিটার-ড্রাম বাজিয়ে তার ভাটিয়ালি ও বাউল ঘরানার গানগুলোকে রক বানিয়ে ফেলেছি, সেটাও মানা যেত, যদি অন্তত তার কথা ও সুরের মূল দিকটা ঠিক রাখতাম। গান লেখার, সুর করার মুরোদ যদি না-ই থাকে, অন্যের লেখা-সুর করা গান তার মতো করেই তো গাইতে হবে, নাকি?
নাগর শিল্পীরা আব্দুল করিমের গান গাইলেন, লন্ডন নিউইয়র্ক থেকে বিভিন্ন শিল্পী ইংরেজি (অথবা হিব্রু-ও হতে পারে, আমি কিছু বুঝতে পারিনি) কিছু ডায়লগ আর কানঝালাপালানিয়া গোলাগুলির শব্দমিউজিকের সাথ তার গানের অ্যালবাম বের করলেন, শুনলাম অনেক বিক্রিও নাকি হয়েছে। কাগজে আর চ্যানেলগুলোতে বস্তার পর বস্তা আলোচনা হচ্ছে, ফেসবুকে আমরা শত শত স্ট্যাটাস আর লিংক পোস্টাইলাম, ক্যাসেট কোম্পানীগুলো তার ক্যাসেটের হাজার হাজার কপি বের করে তুমুল কামিয়ে নিল, প্রচুর শোকসভা হলো বিধান ও অ-বিধানসভায়, কিন্তু লোকটা মারা গেল না খেয়ে, প্রায় বিনা চিকিৎসায়। ছেলে নূর জালালের ভাষ্যমতে, শেষের দিকে আর জাতীয়/আঞ্চলিক পদক আনতে যেতে চাইতেন না, কারণ পদক নিয়ে বাড়ি ফেরার গাড়ি ভাড়া থাকতো না।
ফেসবুকে নজরুল ভাই মন্তব্য করেছিলেন, "এতদিন কিছুই হয় নাই, শাহ্ আব্দুল করিমের গান নিয়ে খেলা এবং ব্যবসা এখন মাত্র শুরু হবে। অপেক্ষা করেন...।"
আব্দুল করিম জানতেন, তাকে নিয়ে ব্যবসা হচ্ছে এবং আরো অনেক হবে। বাংলাদেশের সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি তিনি ভাল করেই বুঝতেন। বুঝতেন বলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে শুরু করে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি পর্যন্ত সবকিছুই তার গানে উঠে এসেছে। সমকাল থেকে দূরে থেকে এক আধ্যাত্মিক কূপে বসবাস করেননি তিনি, অন্য অনেক মারিফতি বাউলের মতো। আধ্যাত্মিকতা/বাউলিয়ানা তার সঙ্গীতের ভিত্তি হলেও সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি তিনি অনুধাবন করেছিলেন বলেই বলে গেছেন, মরার পর হাড়গোড়গুলো নিয়েও ব্যবসা হবে। তবে সেই ব্যবসা এখনো শুরু হয়নি। নজরুল ভাই, অপেক্ষা করতেছি, সেই ব্যবসাটা কবে শুরু হয়, তা দেখার জন্য।
আগামীকাল রাজকুমারের তামসিক খিচুড়ির মজমা
ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বদান্যতায় সে বার কোনো একজন রাগশিল্পী এসেছিলেন জাহাঙ্গীরনগরে। রাগসঙ্গীতের সেই আসরে রাজকুমার ছিলেন এবং পুরো অনুষ্ঠান-ই তিনি মনোযোগ সহকারে উপভোগ করতেন, যদি না রায়হান ভাই এসে তাকে তুলে নিয়ে যেতেন। ঘটনা হলো, রাজকুমারের স্নাতকোত্তরের ভাইবা ছিল ওইদিন। ভাইবা-তে অনুপস্থিত থাকলে বা ফেইল করলে, লিখিত পরীক্ষায় যতো ভালই করুক না কেন- ফেইল। ব্যাপক অনুসন্ধানের পর রায়হান ভাই, পরীক্ষার সময় শেষ হয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর রাজকুমারকে খুঁজে পান এবং বলা বাহুল্য সে বারের মতো রাজকুমারকে ফেইল করার হাত থেকে বাঁচান। তবে কতোটুকু বাঁচাতে পারলেন জানি না, কারণ রাজকুমার তৃতীয় শ্রেণী পেয়েছিলেন, এবং এজন্য তাকে যথেষ্ঠ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণী পাওয়া খুব কঠিন।
আমরা যারা রাজকুমারের ভক্তকুল, এই তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত একটি মানুষকে তার পরেও পছন্দ করি। কারণ আমরা জানি, এই পুরো সমাজ এবং এই ব্যক্তিকে আলাদা করে ফেলা যায় অনায়াসেই। তৃতীয় শ্রেণী চতুর্থ শ্রেণী এইসব নিয়ে কখনো মাথা নিয়ে ঘামাননি তিনি, রাজকুমার পড়ুয়া ছিলেন এবং তার স্বাতন্ত্র্য ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে কোনো চাকরি বাকরি করার থেকে কোনো সাধুসঙ্গে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেওয়াটা তার কাছে অনেক লোভনীয় ছিল। অথবা চা বাগানে। কিংবা কোনো আদিবাসী পাড়ায়। সাধারণ পাতার বিড়ি আর দুয়েক কাপ চা- এই হলেই দিন চলে যেতো রাজকুমারের। একটানা কতোদিন শুধু চা আর বিড়ি খেয়ে কাটিয়েছেন রাজকুমার, এই নিয়ে নানা মিথ প্রচলিত আছে, সর্বনিম্ন ৩০ দিন থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করে সেটা, তবে সত্যিটা বোধহয় আরো অনেক কম। ছবি তুলতে ভালোবাসতেন মানুষটি, তবে বিষয় হওয়া চাই অসূর্যস্পর্শা ধরনের। যে ছবি আগে কেউ তোলেনি এমন বিষয় পছন্দ করতেন তিনি, যদিও তুলেছেন অনেক ঘরোয়া ছবিও।
গাঁজা খাওয়ার ব্যাপারটাকে ব্যাপারটাকে রাজকুমার এক শিল্প-সাধনার পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন। সাধারণ নেশাখোরদের মতো না, রাজকুমার এটাকে তার ধর্মের মতো পবিত্র মনে করতেন। তিনি এটাকে বলতেন সিদ্ধি এবং এটা তিনি সাধনার অংশ হিসেবে সেবন করতেন, নেশা করার জন্য নয়। টেবিল বাজিয়ে গান করা ছিল তার প্রিয় স্বভাবগুলোর একটি। কফিল ভাই, শামীম ভাই বা অন্য কোনো শিল্পী থাকলে তিনি শুধু টেবিল-ই বাজাতেন, মাতাল রাজ্জাকের বিচ্ছেদী গানগুলো সেই আসরের প্রধান উপজীব্য ছিল।
রাজকুমার ছিলেন একজন সত্যিকারের ভালো সঙ্গী। যেকোনো জায়গায় যেকোনো মুহূর্তে যেতে প্রস্তুত ছিলেন রাজকুমার, আহ্বান মাত্র সম্মতি এবং যাত্রা শুরু। বিভিন্ন বিষয়ে তার বিস্তর অভিজ্ঞতা ছিল; ভ্রমণে খুব কাজে দিতো। ভ্রমণ হোক আর অন্য যেকোনো জায়গায়, রাজকুমারের মতো একজন সঙ্গী পাওয়া সত্যিই খুব কঠিন। প্রচুর মতবিরোধ সত্ত্বেও পরমতসহিষ্ণুতা ও তানের ঐক্য তাকে আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল।
রাজকুমার ধান্দাবাজ ছিলেন না। অর্থ, খ্যাতি, ক্ষমতা অথবা অন্য কোনো মোহ তাকে টানেনি একদম। কোনো রকমে একটু মাথা গোঁজার ব্যবস্থা (মানে ঘর হতে হবে এমন না, রাস্তা হলেও চলে) আর পাতার বিড়ি এবং চায়ের সংস্থান- এই ক’টি জিনিসই তার চাহিদা ছিল। এই সারল্য এই যুগে বিরল। এবং সেই সাথে গুরুত্বহীন। কেননা, ক্ষমতাহীন মানুষকে কেউ সঙ্গী করে না। রাজকুমার-ও তাই চিরকাল ছিলেন নিঃসঙ্গ। বিভিন্ন সময় আমাদের বিভিন্ন জনের সাথে তার খুব সখ্য ছিল। হয়তো আমাদের যূথ-এর সাথেও তিনি যূথচারী হয়েছেন অনেক সময়। কিন্তু কেউই আমরা তাকে দেইনি (অথবা আমরা নেইনি) স্থায়ী সান্নিধ্য। কেননা আমাদের চলার পথ অনেক উর্ধগামী, অনেক ক্ষমতা, খ্যাতি ও অর্থমুখী। রাজকুমার আমাদের মোহের অনেক নিচ দিয়ে স্বচ্ছ ঝরনার মতো প্রবহমান থেকেছেন সবসময়, এখনও আছেন।
কিন্তু আমরা সবাই এটা জানি, এই স্বচ্ছতা, এই সারল্য এই নিমোর্হ জীবনের প্রতি আমাদের এক অর্ন্তলীন আকর্ষণ আছে। তাই রাজকুমার যখন পাশে নেই, তখন আমরা স্মৃতিকাতর হই। আমাদের নানা রঙে মাখামাখি জীবনে জলীয় স্বচ্ছতার জন্য আকুল হই।
সবুজ বাঘের আহ্বানে আগামীকাল (শুক্রবার ২৩ অক্টোবর) সারাদিন এবং সারারাত আমরা থাকবো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজকুমার স্মরণ না, আসলে নিজের বিস্মৃতিকেই জাগিয়ে তোলার একটা চেষ্টা; অনেক গাছ কাটা হয়েছে জানবিবি-তে। তবুও এখনো সেখানে গেলে কেন জানি মনে হয়, সারল্য এখনো অপাঙতেয় নয়।
Autobiography- Eight (ইংরেজিতে এখনো অনূদিত হয়নি, দ্রুতই অনূদিত হয়ে বিশ্বকাব্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে)
গৌরচন্দ্রিকা:
হোজ্জার কাছে এক ভদ্রমহিলা আসলেন একটা চিঠি লিখে দেওয়ার অনুরোধ করতে, কারণ তার মেয়ে দূরের গ্রামে থাকে। হোজ্জা বললেন, আমার এখন পায়ে ব্যথা, আমি চিঠি লিখতে পারবো না। মহিলা অবাক হয়ে বললেন, আপনি কি পা দিয়ে লেখেন? হোজ্জা বললেন- চিঠির পাঠোদ্ধার করার জন্য তোমার মেয়ের গ্রামে আমাকে তো পায়ে হেটেই যেতে হবে তাই না?
কবিতার পাঠোদ্ধার আসলে হায়ারোগ্লিফিক্স-এর পাঠোদ্ধারের চেয়ে জটিল। কাব্য-সমালোচকরা যদি কবিতার পাঠোদ্ধারের বদলে সিন্ধুলিপি অথবা উয়ারিলিপির পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করতেন তবে ইতিহাস-সংস্কৃতি কিঞ্চিৎ উপকৃত হতো বলে আমার বিশ্বাস। সুতরাং নিচের কবিতাটি পাঠোদ্ধারের চেষ্টা না করেই পড়ুন।
মূল কবিতা:
কার্ল মাক্স বলেছিলেন, এক সময় উৎপাদন ব্যবস্থা এতো উন্নতি করবে যে মানুষকে আর কোনো কাজ করতে হবে না। যন্ত্রই করবে সব, মানুষের অন্তহীন অবসর।
আমি সেই দিনটির অপেক্ষা করছি।
যখন পাখিরা ঘরে ফিরলো কি ফিরলো না
নদীর জীবনে বাকি রইলো কোন্ লেনদেন
এইসব জটিল সরল-অংক করতে হবে না আমাকে।
আদার ব্যাপারির মতো এড়িয়ে যাবো দিশেহারা জাহাজীর সবুজ ঘাসের দ্বীপ দেখার উচ্ছ্বাস।
অন্ধকার নামুক অথবা অন্ধত্ব-
মুখোমুখি তোমার- গন্ধ নেওয়ার
থেকে বেশি কিছু করবো না আর।
সারমর্ম:
কোনো কাজ করতে ভালো লাগে না। (এই অসুস্থতার অজুহাত যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো, তুমি বলোতো?)
সংবিধিবদ্ধ সর্তকর্তা:
কার্ল মার্ক্সের অন্তহীন অবসরের ভ্রান্ত ধারণাটি নিয়ে কাব্য রচনা করলেও ভুলেও ভাববেন না, তার অন্য সব ভ্রান্ত ধারণাও আমি গ্রহণ করেছি।
সংযোজন ১: সুচৌ-র কবিতার পাঠোদ্ধারের জন্য সুচৌ-এর কাছে আপনারা বঙ্গীয় শব্দকোষ ক্রয়ের নিমিত্তে টঙ্ক কামনা করতে পারেন।
সংযোজন ২: এই সিরিজের পূর্ব ৭টি কাব্য ইংরেজি ভাষায় রচিত হয়েছে, এই কাব্যটিও অচিরেই স্বর্গীয় বর্ণমালায় পরিণতিলাভ করবে। বঙ্গীয় ভাষার মতো একটি পক্ষীভাষা কাব্যসুষমা ধারণের পক্ষে কস্মিন উপযোগী নহে।
আমার ডলফিনগুলো-১
শীতলক্ষ্যার পাড়ে জন্ম আমার। শৈশব কেটেছে ওই নদীকে কেন্দ্র করেই। বৃষ্টি হলেই কেন যেন নদীটা টানতো আমায়। সবার অলক্ষ্যে একটা পানশি অথবা কোশা (কুশা) নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম নদীতে। জাল থাকতো নৌকাতেই, না হলে নিয়ে যেতাম সঙ্গে করে। তারপর জাল ফেলে মাছ ধরা। তখন মাছ-ও পাওয়া যেত বেশ। জাল ফেললেই মাছ। পুটি আর ছোট চিংড়ি পেতাম বেশ। তবে অন্য মাছ-ও পেতাম। এমনকি রুই কাতলা বোয়ালের মতো পোষা মাছ-ও পাওয়া যেত। একবার তো বিরাট একটা কালো কুচকুচে তেলতেলে মাছ উঠলো জালে। এই মাছ খাওয়া যায় কিনা, এটা সাপ জাতীয় কিছু কিনা, এই নিয়ে আমি আর সহ-জেলে চাচাতো ভাই গুরুগম্ভীর আলোচনা শুরু করলাম। পরে আমরা সিদ্ধান্তে আসলাম, এটা আসলে শিশুর বাচ্চা। সুতরাং আমরা এটাকে নদীতেই আবার ছেড়ে দেওয়া যাক।
শিশু মাছের নামটা কেন শিশু মাছ হলো, এটা মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। সেবার চনপাড়া থেকে ইছাখালি পর্যন্ত নৌকা করে আসছিলাম আমরা। গয়না নৌকা - ছৈ দেয়া। মা, আমরা তিন ভাইবোন আর আমার খালু। যদিও খালু, কিন্তু তিনি আবার আমার নানার ভক্তশিষ্য। আমার নানা ছিলেন বাউল ধরনের মানুষ। নিজেই গান লিখতেন, সুর করতেন এবং গাইতেন। স্বভাবতই তার কিছু শিষ্য জুটেছিল। চনপাড়া থেকে রওনা হওয়ার কিছুক্ষন পরেই নতুন চরে এসে মাঝিরা নৌকা ভিড়িয়ে দিল। অনেক দূরের পথ, সুতরাং কিছু খাওয়া দাওয়া করা দরকার। খালু, আমি এবং মাঝিদের একজন চললাম নতুন চরের অস্থায়ী বাজারে। কতো জাতের যে মাছ উঠেছে! শীতলক্ষ্যা যেখানে মেঘনার সাথে মিশেছে, সেটা বেশি দূরে না হওয়াতে সদ্য আহরিত ইলিশ-ও পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। আমরা বেছে বেছে শেষমেষ ইলিশ-ই কিনলাম। আরো কিছু বাজারসদাই করে, চরেই রান্নাবান্না করে খেয়েদেয়ে আমরা রওনা হলাম। ঠিক তখনই কয়েকটা বিশাল মাছ লাফিয়ে উঠলো নদীতে, মাকে জিজ্ঞেস করলাম- এই মাছের নাম কি? মা বলে, এদের নাম শিশু। এতো বড়ো মাছের নাম কেন শিশু, তার জবাব মা, খালু বা মাঝিরা কেউ দিতে পারলো না। আমরা তিন ভাইবোন ছৈ-এর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে শিশু মাছেদের খেলা দেখতে লাগলাম। বিশেষ করে চেইন করে করে যে লাফগুলো দিচ্ছিলো, তা ছিল অসাধারণ। মাঝিরা আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছিলো- এতো কিনারে যাইও না, পইড়া যাইবা। মাঝিরা বলে বলে পনেরোটা, বিশটা শিশু আছে নদীতে; আমার অবশ্য পরে মনে হয়েছে শত শত শিশু আছে নদীতে।
তখনো আমরা টেলিভিশনে ডলফিনের ব্যাপার স্যাপারগুলো বুঝে উঠতে পারিনি। ডলফিনের বাংলাই যে শুশুক এবং তার স্থানীয় বিকৃতি যে শিশু তা-ও আমাদের মাথায় ঢোকেনি। তবু এতো বিশাল বিশাল মাছেদের এতো শিশুসুলভ কাণ্ডকারখানা আমাদের মুগ্ধ করতো।
বৃষ্টি হলেই তাই নদীতে ছুটতাম। মাছ ধরা তো আছেই, শিশুগুলোর কাণ্ডকীর্তি দেখাও একটা উপলক্ষ ছিল। একবার তো মাছ ধরে যেই না নদীর এক বাঁকে এসেছি, দেখি কি আমার পচাঁত্তরোর্ধ্ব নানা বৃষ্টির মধ্যে নদীর পাড়ে বসে একমনে শিশুর খেলা দেখছে। আমি “ও-ও-ও-ও নানা, একলা একলা বইসা কি করোগো নানাআআ?” বলে যেই না হাঁক দিয়েছি, অমনি তিনি “তফাৎ যা, তফাৎ যা” বলে চেচিয়ে উঠলেন। নানা আমাকে খুব ভালোবাসতেন, সুতরাং তার এই অকস্মাৎ রূঢ় ব্যবহারে দুঃখ পাওয়ার কথা থাকলেও, মোটেই দুঃখ পেলাম না। বরং এই ঘটনার কথা চিন্তা করে সেদিন-ও মজা পেয়েছি, এখনো হাসি পায়। বুড়া একটা লোক ঝুম বৃষ্টির মধ্যে একা একা বসে শিশুর খেলা দেখে! নৌকা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে আমি দ্রুত তার চোখের আড়ালে চলে গেলাম। সেদিন-ও একগাদা মাছ ধরেছিলাম। ঢাকায় এনে স্কুলে ভর্তি করিয়ে না দিলে আমি হয়তো জেলেই হতাম একটা। নানা জাত বেজাতের মাছ ধরে সেগুলোকে নতুন চরের বাজারে বিক্রি করে লবন, তেল কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। মাকে বলতাম- নে মা তোর মাছ, তেল, লবন; শিং মাছ আর উচ্ছের ঝোল দিয়ে গরম গরম ভাত খাব আজ।
জেলে হওয়া আর হলো না, তবে সুযোগ পেলেই শিশুগুলোকে দেখতে যেতাম। কয়েকদিন আগেই তো রাজকুমার* সমভিব্যহারে বাড়ি গেলাম। যদিও এখন অনেক রাস্তাঘাট হয়েছে, এখন আর নৌকা করে কেউ যায় না, তবু শিশু দেখার লোভে আমি আর রাজকুমার নৌকা ভাড়া করলাম। পৃথিবীর সব নোংরা আর দুর্গন্ধ সহ্য করতে সক্ষম বলে জানতাম যে রাজকুমারকে, সে-ও পুরো নৌযাত্রাটিতেই রুমাল দিয়ে নাক চেপে রাখলো। আমি কিন্তু নাকে রুমাল দেইনি। কারণ আমি জানি, এই রাস্তা এই ব্রীজ এই কলকারখানা এই সবকিছুর জন্য আমিই দায়ী। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমার বাবা, মামা, খালুরা কতোবার যে মন্ত্রী এমপি-দের কাছে গেছে, রাস্তা করেন, ব্রীজ করেন, ঢাকার এতো কাছে অথচ শিল্পায়ন হলো না, একটু শিল্পায়নের উদ্যোগ নেন, কতো দেন দরবার নিয়ে। অবশেষে রাস্তা হলো, ব্রীজ হলো, শিল্পায়ন হলো, নদীর নতুন চরে এডিবল তেলের কারখানা হলো। আর আমার শিশুরা পচে গলে মিশে গেল শীতলক্ষ্যার পানির সাথে। আমার নিজের অপরাধে আমার শৈশবের সঙ্গীদের মৃত্যু হলো, আর আমি তার পঁচা গলা শরীর মেশানো পানির গন্ধে নাকে রুমাল দেই কিভাবে?
*রাজকুমার সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন


