Sunday, November 15, 2009

মুসা সাহেব কহেন বিস্তর

যে কহে বিস্তর, সে কহে বিস্তর মিছা। তাই সকলেরই থামা ঊচিত। বিশেষ করে বেশি শ্রান্ত হয়ে গেলে। মুসা সাহেব থামছেন না। আজকের প্রথম আলো-তেও লিখেছেন। বলা বাহুল্য, অতিকথনের সমস্যায় আক্রান্ত হয়েই। একটি লাইন উদ্ধৃত করি, 'আমি আনু মুহাম্মদ অথবা গ্যাস-তেল আহরণ নিয়ে বিতর্কে সরকারের ইজারা প্রদান সিদ্ধান্তের পক্ষে।' সুবিধাবাদিতা কতো চরম মাত্রায় পৌঁছালে সংবাদপত্রে কলাম লিখে নিজের এই অবস্থান সংবাদপত্রে কলাম লিখে প্রকাশ করা যায়, এটি তার একটি নমুনা। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৯ হরতাল ডেকেছে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি, এর বিরোধিতা করে আজকেই একটি সংবাদ সম্মেলন করলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন, তেল-গ্যাস রপ্তানী বিষয়ে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা আগের অবস্থানেই আছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ আগে যেভাবে তেল-গ্যাস রপ্তানীর বিরোধিতা করেছে, এখনো সেভাবেই বিরোধী (বাস্তবতা যদিও ভিন্ন কথা বলে)। এবং স্মরণ করুন সেইসব দিনের কথা যখন মুসা গং পত্রিকায় কলাম লিখে বিএনপি-র তেল-গ্যাস ইজারা ও রপ্তানী নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। আর এখন সরকার পরিবর্তনের পর তিনি লিখছেন, যদি সব্জি রপ্তানী করা নিয়ে কোনো আন্দোলন না হয়, তা হলে গ্যাস রপ্তানী নিয়ে এতো আন্দোলন কেন? সরকার বদল হলে চান্দি গরম হয় জানি, কিন্তু তাই বলে সব্জি এবং গ্যাস-কে একই রকম দেখার মতো গরম হয়, সেটা ভাবিনি।

তাই বলছি, মুসা সাহেব এবার থামেন; একটু দম নেন।

সারমেয় সমাচার

১.
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি আওয়ামী লীগের কোনো কমিটমেন্ট কখনো ছিল না, এটা চিরন্তন সত্য। কিন্তু তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্রের কলকাঠি নাড়াচাড়া করার লাইসেন্স পাওয়ার ফলে আমি ধারণা করেছিলাম, প্রতিপক্ষকে ট্যাকল করার কৌশলে তারা কিছু বদল আনবে। কিন্তু কয়লা ধুলে যেমন ময়লা যায় না, আওয়ামী লীগের সারমেয়-স্বভাবেরও তেমনি কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রভুদের বিরুদ্ধে কিছু বলা মাত্র কুকুরের মতো ঝাপিয়ে পড়ার আওয়ামী লীগের পুরনো কৌশল আবারো দেখা গেল আজ।

২.
শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম(?)-এর যে কি অবস্থা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-র মন্ত্রী-নেতারাই তা খোলাশা করেছেন। তাদের বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপস, অডিও টেপ এবং জবানবন্দীমূলক চিঠিপত্র এখনো ইন্টারনেটে সার্চ করলে পাওয়া যায়; ওইগুলোতে স্পষ্ট করেই নেতারা তাদের শীর্ষনেত্রী ও অন্যান্য নেতাদের দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন, কবে কার কাছ থেকে কিভাবে ঘুষ নিয়েছেন, চাদাবাজি করেছেন, দুর্নীতি করেছেন, সবকিছুই দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার।

৩.
তারপরেও আমি আশা করেছিলাম, কৌশলে পরিবর্তন আসবে। প্রভুদের বিরুদ্ধে মিছিল দেখলেই দাঁত-নখ বেরিয়ে আসবে, এটা আশা করিনি। পেট্রোবাংলার সামনে গেলে আনু মুহাম্মদ কি করতেন? পেট্রোবাংলায় পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিতেন? আমি তো জানি, আনু মুহাম্মদ এবং তার অনুসারীরা পেট্রোবাংলাকে পছন্দই করেন; বিদেশী কোম্পানীগুলোকে কাজ না দিয়ে বরং পেট্রোবাংলাকে আরো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করা হোক, এটাই তো তারা চেয়েছেন। সুতরাং আনু মুহাম্মদকে লাঠি দিয়ে না ঠেকালেও হতো। তিনি পেট্রোবাংলার সামনে গেলে আসলে কিছুই হতো না, অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ওখানে তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে কিছু বক্তৃতা-টক্তৃতা করতেন এবং একটা নতুন কর্মসূচি দিতেন। খুবই সাধারণ ব্যাপার হতো এটা। কিন্তু হলো না, তার কারণ- রাষ্ট্র।

৪.
আনু মুহাম্মদ-এর ওপর হামলাকে আমি রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলেই মনে করি। প্রথমত, খুবই সাধারণভাবে বলি- আনু মুহাম্মদের ছাত্রজীবন, শিক্ষকতা, লেখালেখি এবং রাজনীতি বরাবর বাংলাদেশের মানুষের পক্ষেই থেকেছে। তিনি আমার কাছে তাই রাষ্ট্রের প্রতীক। ফলে তার প্রতি হামলাকে আমি বাংলাদেশের প্রতি হামলা হিসেবে মনে করি। স্বাভাবিকভাবেই আমি মনে করি, আনু মুহাম্মদের ওপর হামলা একটি রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কাজ এবং যে পুলিশ ও তাদের নির্দেশদাতা আমলা-রাজনৈতিক এর সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলায় বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত।

৫.
কিন্তু আসলে সেটা হবে না। কারণ রাষ্ট্রের কলকাঠিওয়ালারা ঠিক এইভাবে ভাবেন না। রাষ্ট্র বলতে উনারা বোঝেন উনাদের ক্ষমতা। রাষ্ট্র বলতে কিন্তু আসলে ক্ষমতাটিই বোঝায়। সেই ক্ষমতা হলো- গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি মোটেই গণতান্ত্রিক নয় এবং এর সংবিধানের অনেক জায়গাতেই গণতন্ত্রবিরোধী কথাবার্তা আছে। আওয়ামী লীগ যদিও ভোটের আগে এগুলো নিয়ে কিছু কিছু কথা বলেছে, কিন্তু এখন ভুলে গেছে। কিন্তু তার চেয়েও ভয়াবহ হলো, বাংলাদেশের শাসকদল ও গোষ্ঠী রাষ্ট্র বলতে বোঝেন ক্ষমতার ব্যবহার। যে ক্ষমতা জনগণ এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ভূমি ও সম্পদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার কথা, সেই ক্ষমতাকে বিদেশি কোম্পানী ও বিভিন্ন ব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করাটাকেই কেউ কেউ রাষ্ট্র বলে মনে করে।

৬.
বাংলাদেশের জ্বালানী ক্ষেত্র বিষয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একবার দুর্নীতি মামলা হয়েছিল, সেই মামলা থেকে তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে খারিজ করে দিয়েছে। গত সপ্তাহে (২৪ অগাস্ট) তিনি আবার তাল্লু এবং ফিলিপসকে ৫, ১০ ও ১১ নং ব্লক বরাদ্দ দেন। সেই পুরনো কাসুন্দি। বাংলাদেশ পাবে ২০ ভাগ, কোম্পানী পাবে ৮০ ভাগ। আর এই ৮০ ভাগ আবার বাংলাদেশকে কিনতে হবে আন্তর্জাতিক বাজারদরে। কার্যত, গ্যাসের খনি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে চড়াদামে গ্যাস কিনতে হবে বাইরের কোম্পানির কাছ থেকে। যেন স্বর্ণকারের কাছে গয়না বানানোর জন্য সোনা দেয়ার পর এখন আন্তর্জাতিক দরে ৮০ ভাগ সোনার দাম দিতে হচ্ছে। এমন অসম চুক্তি পৃথিবীর ইতিহাসে নাই। অন্তত গুগলে সার্চ দিয়ে আমি খুঁজে পাইনি।

৭.
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংজ্ঞা অনুসারে শেখ হাসিনার এই কাজ দেশপ্রেমিকমূলক। কেননা দেশের স্বার্থেই তার সবকিছু করার কথা। দেশদ্রোহীমূলক কোনো কিছুই তিনি করতে পারবেন না, এই শপথ তিনি নিয়েছেন। "রাজা যখন অন্যায় করেন, তখন তিনি আর রাজা থাকেন না" রবীন্দ্রনাথের এই কথা অনুসারে হয় তিনি তার কর্তৃত্ব হারিয়েছেন অথবা তিনি দেশপ্রেমমূলক ও ঠিক কাজটিই করেছেন।

৮.
শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের যে কি হাল, তা আগেই একবার বলেছি। বর্তমান কাজটিও যদি ওই রকমই কিছু হয়ে থাকে, তবে তা বাংলাদেশের জন্য খুবই বিপদজনক। কেননা সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞানুসারে এর ফলে রাষ্ট্রটি আসলে খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে, বস্তুত ভাঙ্গা। তার পরেও আনু মুহাম্মদের কাজটিকে কেন আমি দেশপ্রেমমূলক বলছি এবং তার ওপর হামলাকে দেশদ্রোহিতা বলছি? তার কারণ আমি এই চুক্তিটিকে যৌক্তিক ও হিতকর মনে করি না- তা নয়। তার চেয়েও বরং এই কারণে আরো বেশি যে, রাষ্ট্র কখনো আসলে শূন্য থাকে না। আনু মুহাম্মদ সেই শূন্যস্থান পূরণ করে একটি দেশপ্রেমের দৃষ্টান্তই রেখেছেন।

৯.
তাই বলছি, আনু মুহাম্মদের ওপর হামলাকারী পুলিশ এবং নির্দেশদাতা আমলা ও রাজনীতিকেদর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন।

ছবি- রানা রায়হানের ফেসবুক অ্যালবাম থেকে

ফারিয়া, তোমার জন্য...

ফারিয়া

বাবা-মা দুর্ঘটনায় মারা গেছে, নিজেও আক্রান্ত দুরারোগ্য ব্যাধিতে। তা সত্ত্বেও আমাদের সংরক্ষণ কাজে সবচেয়ে আগ্রহী মানুষটি ফারিয়া। প্রতিদিন এসে কাজের খোঁজখবর নিচ্ছে, আমাদের দলের কে কেমন আছে, অভিভাবকসুলভভাবে দেখভাল করছে। ওর ভাই-বোন (যাদের সাথে থাকে) আমাদেরকে চাচা-মামা ডাকলেও ফারিয়া এসব সাধারণ (কমন) সম্পর্কে আগ্রহী নয়। প্রত্যেকের সাথে তার ওয়ান-টু-ওয়ান সম্পর্ক, প্রত্যেককে কাস্টমাইজড নাম দিয়েছে সে। সাধারণত নামের আদ্যক্ষরটিকেই নাম হিসেবে তার পছন্দ, নিজের নাম বলে ‘ফা‌'। সুতরাং আমাদের দলের অধিকাংশ সদস্যই তার কাছে শা, আ, স ইত্যাদি। আমাদের ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের ডাক নাম যে চুন্নু, ফারিয়া-র ‘চু' অনুসন্ধান ব্যতীত এটা আমি জানতেই পারতাম না। তবে একই অক্ষর একাধিক হয়ে গেলে অথবা কোনো বিশেষ কারণ থাকলে অন্য কোনো শব্দ বা অক্ষর বেছে নেয় সে। যেমন মামুন-কে ‘বন্ধু’ নামে কাস্টমাইজ করেছে, কেননা ‘মা’ অক্ষরটি অন্য কারো জন্য বরাদ্দ করতে সে আগ্রহী না। আমি যদিও এই দলের সবচেয়ে মুরব্বী সদস্য না, তবে দলনেতা হওয়ার কারণে প্রায়ই মুরব্বী গোছের লোকদের সাথে আমার আনাগোনা থাকায় আমাকেও আদ্যাক্ষর দিয়ে বিভূষিত করা যাবে কিনা, এ বিষয়টি ফারিয়া এখনো নিশ্চিত নয়। তাই ‘এই, ওই, এই যে’ ইত্যাদি ভূষণ নিয়েই আপাতত থাকতে হচ্ছে। আমাদের সিগারেট খাওয়া নিয়ে তার সুস্পষ্ট বিধিমালা আছে, তা হলো- ফারিয়া থাকা অবস্থায় সিগারেট খাওয়া যাবে না, খেতে হলে দূরে গিয়ে খেতে হবে এবং ফারিয়াকে দেখা মাত্র সিগারেট ফেলে দিতে হবে- এর কোনো ব্যতিক্রম হলে ও আমাদের কাছে আসবে না। আর ওর সঙ্গ পছন্দ করে না, এমন সদস্য আমাদের দলে নেই। আমাদের দলের সদস্যদের তোলা ফারিয়ার ছবির কয়েকটি আমার ফেসবুকের এই অ্যালবামে আছে। (শুধু ফারিয়া-কে নিয়ে পরে একটা আলাদা পোস্ট দিবো, আশা করছি)।

১.
আজ সকালে যখন সাইটে গেলাম, দূর থেকে দেখলাম একটা মিছিল। কাছে গেলে বুঝলাম- একদল স্কুলের বাচ্চা এসেছে আমাদের কাজ দেখতে। প্রতিদিনই শত শত শিশু এখানে আমাদের কাজ দেখতে আসে। আশেপাশের এবং দূরের স্কুল, কিন্ডারগার্টেন এবং মাদ্রাসা থেকে শিশুরা দলবেঁধে কিংবা একা একা আসে। বড়োদের থেকেও ওদের উৎসাহ অনেক বেশি। এবং বড়োদের অনেকের মধ্যে যে অতিলৌকিক সংস্কারগুলো আছে, শিশুদের মধ্যে সেটা নেই। এতো বছরের পুরনো একটি ভবন, যা তৈরি করেছে জ্বীন-পরীরা, সেটা কি মানুষের পক্ষে পুনর্নিমার্ণ করা সম্ভব? এই প্রশ্নের জবাবে বড়োরা অনেক সময় দ্বিধান্বিত হলেও শিশুরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে- এর সংস্কার ও সংরক্ষণ হবেই।

২.
ফারিয়া কখনো এই লেখা পড়ার মতো বড়ো হবে কিনা, জানিনা। কিন্তু ফারিয়া এবং/অথবা অন্য সব শিশুরা একদিন বড়ো হবে। ওরা জানবে, এই দেশ সেই দেশ যে দেশে অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুদ্রা চালু হয়েছে পৃথিবীর সব দেশের আগে। (৬ষ্ঠ খৃস্টপূর্ব শতাব্দীতে উয়ারীতে প্রবর্তিত ইউনিফর্মড মুদ্রাব্যবস্থার আগে বিশ্বের কোথাও মুদ্রা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল না)।

পৃথিবীর দেশগুলো যখন বিদ্যালয় কি এই বিষয়টিই জানতো না, তখন আমাদের উপমহাদেশেই প্রথম তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয় (তক্ষশিলা)। খৃস্টপূর্ব চতুর্থ থেকে খৃস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে আমাদের দেশে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয় (মহাস্থানগড়, হরিশচন্দ্র নির্মিত বিদ্যায়তন, সোমপুর বিহার, কুমিল্লার বিহারসমূহ ইত্যাদি), ইউরোপ যখন বিশ্ববিদ্যালয় কি, তা-ই জানতো না।

বর্তমান ডিজিটাল বিশ্ব যে দশমিক পদ্ধতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই দশমিক পদ্ধতি ও শূন্য এই বাংলাতেই আবিষ্কৃত হয়।

আমাদের দেশ এতোই অতিথিপরায়ণ ও সমৃদ্ধ যে এই দেশ অনুপ্রবেশকারী যোদ্ধা এই দেশেই জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে এমন কি নিজের ছেলের সাথে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন রাখার চেষ্টা করেছে।

যে আলেকজান্ডারের ভয়ে সারা বিশ্ব কাপঁতো থর থর করে করে, সেই আলেকজান্ডার বাঙালি বীরের (নন্দ) বীরত্বগাঁথা শুনে অস্ত্র সংবরণ করেছিলেন।

এমনি আরো শত শত গল্প এইসব শিশুরা জানবে। শুধু জানা নয়, এইসব ঋদ্ধ অতীত আমরা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেছি এটাও ওরা দেখবে।

৩.
এই যে নগর-সংসার ছেড়ে এই প্রত্যন্ত প্রান্তরে পড়ে আছি, তার প্রধান কারণ- ফারিয়া এবং/অথবা অন্য সব শিশুরা যখন বড়ো হবে, ততদিনে আমরা এই দেশের আরো অনেক স্থাপনা এবং অন্যান্য নিদর্শন সংরক্ষণ করতে পারবো। ওরা বিশ্বের কাছে আমাদের গৌরবগাঁথা গর্ব করে বলবে এবং সেই সাথে এই গৌরবান্বিত অতীত থেকে অভিজ্ঞতা ও উৎসাহ নিয়ে আরো গর্ব করার মতো ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমাদের যতো প্রয়াস, সব ওদের জন্যই।

পরামর্শ চাই : রাণীশঙ্কৈল-এর ঐতিহাসিক রাধামাধব মন্দির পুনরানয়নের জন্য কিভাবে টাকা পাই?

ঠাকুরগাঁওয়ের জমিদারদের মধ্যে বুদ্ধিনাথ চৌধুরী কিছুটা ব্যতিক্রমী। সমকালীন অন্য জমিদারদের চেয়ে তার খ্যাতি একটু বেশিই ছিল। পৈত্রিক সূত্রে বাবা বুদ্ধিনাথ-এর কাছ থেকে জমিদারি পান টঙ্কনাথ। তিনিও তার সময়ে অত্যন্ত খ্যাতিমান ছিলেন। জমিদারির ব্যাপ্তী এবং শাসনকাজের বলিষ্ঠতার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে রাজা উপাধি পেয়েছিলেন তিনি। রাণীশঙ্কৈল থানার পূর্বপাশে কুলিক নদীর তীরে মালদুয়ারে রাজা টঙ্কনাথের রাজবাড়ি। রাজবাড়িটির খুব কাছেই রাধামাধব মন্দির। ১৮৫০ সালের দিকে জমিদার বুদ্ধিনাথ চৌধুরী বাড়িটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। একই সময়ে তিনি কয়েকটি বিদ্যালয়ও নির্মাণ করেন। মন্দিরটিও ঐ সময়ে নির্মিত হয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। ভিক্টোরিয়ান শৈলীতে নির্মিত তিনতলা বাড়িটির বিভিন্ন অংশের কাজ শেষ করেন রাজা টঙ্কনাথ চৌধুরী। মন্দিরটি বাড়ি তৈরির সমসাময়িক হলে এর বয়স প্রায় ১৫০ বছর।

দেশীয় রীতিতে ইটের তৈরি আটচালা মন্দিরটির সারা গা জুড়েই রয়েছে অসংখ্য কারুকাজ। জ্যামিতিক নকশা ছাড়াও নানা প্রাণী ও উদ্ভিদচিত্র পুরো মন্দিরের গা জুড়েই অলঙ্কৃত করা হয়েছে। সাধারণত মন্দিরগাত্রের অলঙ্করণগুলো পোড়ামাটির ফলক দিয়ে আবৃত থাকে। এখানে পোড়ামাটির ফলকচিত্র ছাড়াও ইট কেটে বা পলেস্তারা নকশা করে ফলক খোদিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে এই অনন্যসাধারণ মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, মন্দিরের পুরোহিত ও টঙ্কনাথ চৌধুরী পরিবারের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে যান। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে এই মন্দির।

সম্প্রতি আমাদের অনুপ্রেরণায় স্থানীয় জনসাধারণ এই মন্দিরটি পুনরানয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মন্দিরের আদি বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই ব্যবহারোপযোগী করার জন্য প্রয়োজনীয় কর্ম ও ব্যয়-পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক কাজ-ও শুরু হয়েছে। এখন প্রয়োজন মন্দির পুনরানয়ন কাজকে বেগবান করার জন্য ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা।

এই মন্দিরটির সংরক্ষণ কাজ করতে প্রায় ২০ (বিশ) লাখ টাকা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত স্থানীয় উদ্যোগে ১ (এক) লাখ টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। বাকী টাকা কিভাবে সংগ্রহ করা যায়, সে বিষয়ে সচলদের কাছে পরামর্শ চাচ্ছি।

ঐতিহ্যবাহী প্রত্নস্থানগুলো বেছে বেছে ইউক্যালিপটাস লাগাচ্ছে কেন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো?

ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশে ইউক্যালিপটাস গাছের সারি

সম্প্রতি কোনো ঐতিহ্যবাহী প্রত্নস্থানে গিয়েছেন? গেলে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, স্থাপনাটির চারপাশে সারি সারি ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো। মহাস্থানগড় বলুন আর দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির-ই বলুন সবখানেই স্থাপনাটির বাফার এরিয়ার ভেতরেই আপনি হয়তো দেখেছেন, ইউক্যালিপটাস। সত্যি কথা বলতে কি, কিছু না জানলে আপনার হয়তো ভালই লাগবে- আর কিছু না, গাছ বলে কথা। ইন্টারনেটে একটু সার্চ দিলে আপনি হয়তো ইউক্যালিপটাস সম্পর্কে অনেক কথাই জেনে যাবেন। দ্রুত বর্ধনশীল এই কাঠদায়ী গাছের অর্থকরী গুণের বর্ণনায় অনেকে মুখরোচক তথ্যই আপনি পাবেন। তবে, অনেক কথাই আপনি পাবেন না। আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে কেন এই গাছের বিরুদ্ধে রীতিমতো রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেই সব তথ্য অনেক কম-ই পাওয়া যায়। তবে তবু আপনি জানতে পারবেন, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার মানুষ এই গাছের বিরুদ্ধে সোচ্চার- এই গাছ তাদের সনাতন কৃষি পদ্ধতি, পরিবশ এবং সংস্কৃতির জন্য হুমকি বলে তারা মনে করে। আমাদের দেশেও ফরহাদ মজহার-রা এই গাছের বিরুদ্ধে, তাদের প্রধান যুক্তি- ওই সনাতন হারালো বলেই। রাস্তার দু'ধারে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানীর লাগানো ইউক্যালিপটাস, শিশু এবং অ্যাকাশিয়া বিষয়ে চিন্তার একটা সংখ্যাও বেরিয়েছিল।

আমরা প্রত্নতাত্ত্বিকরা ক্ষুদ্ধ অন্য একটি বিশেষ কারণে। এতোদিন ধরে এই গাছ আমরা কেবল রাস্তার দুই ধারেই দেখতাম, এই কাজের জন্য কয়েক বছর ধরে তারা প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপন পুরস্কার-ও পেয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আমরা লক্ষ্য করছি, ঐতিহ্যবাহী প্রত্নস্থানগুলোর চারধারে এই গাছ লাগানো। সত্যি কথা বলতে কি, যে উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানী এই গাছ এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে গণহারে লাগাচ্ছে, সেই উদ্দেশ্যটি প্রত্নস্থানের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। সেটি হলো- পানি শোষণ। এই গাছ বিপুল পরিমাণে পানি শোষণ করে। এর ফলে এটা সেচ ব্যবস্থা ও কৃষি ব্যবস্থার ওপর একটা প্রভাব ফেলে।

আর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার পাশে এই গাছ লাগালে, এটা ভূমির পানি শোষণ করে, তখন ভূমি পাশ্ববর্তী স্থাপনার মধ্যে থাকা আর্দ্রতা শোষণ করে। এর ফলে ওই স্থাপনাটি আর্দ্রতা হারিয়ে নিজের মধ্যকার দৃঢ়তা হারায়। ক্রমাগত সঙ্কোচন ও প্রসারণের ফলে ভবন বা স্থাপনাটি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে ভেঙ্গে পড়ে।

এবং আমি মনে করি, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানী এই কাজটি ষড়যন্ত্রমূলকভাবেই করছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেশকে ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে দূরে রাখার জন্য এই রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কাজটি তারা করছে রাষ্ট্রকে পুরো অন্ধ রেখে। অথচ এই কাজের জন্যই তারা ফি বছর রাষ্ট্রীয় পদক পেয়ে যাচ্ছে।

যে চাষীদেরকে প্রলুব্ধ করে, ব্যাট এই গাছ লাগিয়েছে, তারা গাছগুলো কাটতে পারছে না। কারণ তাদের সাথে চুক্তি ছিল, এই গাছগুলো নির্দিষ্ট সময় আগে কাটা যাবে না এবং এই গাছের আশেপাশে কোনো দেশীয় গাছ লাগানো যাবে না। ফলে কৃষকের পক্ষে খুব একটা কিছু করা সম্ভব না। কিন্তু যারা দেশ নিয়ে ভাবেন, রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কাজের আইনগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাদের কাছে একটা অনুরোধ, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংসের জন্য তাদের এই রাষ্ট্রদ্রোহী কাজের বিরুদ্ধে একটা কিছু করুন।

***ইউক্যালিপটাস সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন। এই লিংকটি পাওয়া না গেলে আমাদের ওয়েবসাইট-টিতেও দেখতে পারেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া মসজিদ সংরক্ষণ ২য় কিস্তি

বালিয়া মসজিদ সংরক্ষণের কিছু ছবি আমার ফেসবুকের এই অ্যালবামে এবং আমাদের একটি ওয়েবসাইটের অ্যালবামে দেয়া আছে, কেউ আগ্রহী হলে দেখতে পারেন।

বালিয়া মসজিদের সবচেয়ে কাছের বাড়িটি নবীরুলের। সুতরাং মসজিদটির ইতিবৃত্ত নবীরুলের কাছে কিছু জানা যাবে ভেবে আমরা তার কাছেই প্রথমে জিজ্ঞেস করি। নবীরুল দ্বিধাহীন চিত্তে জানায় সে নিজের কানে স্পষ্টভাবে শুনেছে, এই মসজিদটির ভেতরে পরীদের আনাগোনার শব্দ, তাদের নূপুরের নিক্কণ তার কানে এখনও পরিষ্কার বাজে। নবীরুলের পরী-কাহিনী মসজিদটি সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প হলেও, সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় গল্প হলো- রাতারাতি মসজিদটির গজিয়ে ওঠার কাহিনী। একরাতের মধ্যেই নাকি মসজিদটি তৈরি করা হয়, অতিরিক্ত অলঙ্করণ ও পুরু দেয়াল তৈরি করতে করতে ভোর হয়ে যাওয়ায় মসজিদটি শেষ করা যায়নি আর, গম্বুজ তিনটি তৈরি না করেই চলে যায় জীনপরীরা। অন্যদিকে ইছহাক চৌধুরী আমাদের শোনালেন বাঘ ও খরগোশের গল্প। এই মসজিদে নাকি একই সাথে বাঘ ও খরগোশ থাকতো। গাছপালার জঙ্গলটিতে একটি ছোট্ট গহ্বর করে একটি গুহা সৃষ্টি করেছিল সেই বাঘ। সেখানে সে বাচ্চাসহ থাকতো। নিজ চোখে মসজিদ সংলগ্ন পুকুরঘাটে বাঘের পানি খাওয়া এবং পানি খাওয়া শেষে গুহামুখ দিয়ে মসজিদগুহায় প্রবেশ করতে দেখেছেন ইছহাক।

এমন অনেক গল্প আপনি পাবেন ঠাকুরগাঁও জেলাসদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরবর্তী বালিয়া গ্রামের এই মসজিদটি সম্পর্কে। অনেকে অনেক ভাবে আপনাকে গল্পগুলো বলবে। নানা মত, নানা ভাষ্য শুনবেন আপনি। তবে সবারই একটাই প্রশ্ন, এই প্রত্যন্ত পাড়াগায়ে কে বা কারা অথবা কেন এই নয়নাভিরাম স্থাপত্য নির্মাণ করেছিল। এমনকি স্থানীয় এলজিইডি-র ইঞ্জিনিয়ার লিটন পর্যন্ত বললেন, আমি তো এই এলাকায় আট বছর ধরে আছি, এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করি, কোনো দিন তো এই মসজিদটি চোখে পড়েনি, এই মসজিদটি কি রাতারাতি তৈরি হলো?

না, নয়নাভিরাম মসজিদটি রাতারাতি তৈরি হয়নি। যদি স্থানীয় শাসককেই স্থাপনার নির্মাতা বলা হয়, সেক্ষেত্রে ‘মহারাজাধিরাজ’ নৃপেন্দ্র নারায়ণের অন্তর্গত শালবাড়ি পরগণার জমিদার বিবি গুলমতি চৌধুরানী এই মসজিদের নির্মাতা। পরম্পরায় প্রকাশ, গুলমতি চৌধুরানীর পতি মেহের বক্শ-এর দাদা পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদদৌলার পরাজয়ের পর নিপীড়নমূলক অবস্থায় আত্মরক্ষার্থে পাটনা থেকে জলপাইগুড়ি চলে আসেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে তার পুত্র এবং মেহের বক্শ-এর বাবা রাজ-এ-মোহাম্মদ ঠাকুরগাঁও মহকুমার বালিয়ায় এসে ব্যবসা বাণিজ্য করে সমৃদ্ধি অর্জন করেন। স্থানীয় জমিদারের সাথে সুসম্পর্কের প্রেক্ষিতে তার ছেলে মেহের বক্শ-এর সাথে তৎকালীন জমিদারকন্যার পরিণয় সর্ম্পক স্থাপিত হয়। যদিও জমিদারী বিবি গুলমতি চৌধুরানীর নামেই ছিল, কিন্তু কার্যত শাসন করতেন মেহের বক্শ। ফলত মসজিদটি তিনিই নির্মাণ করেছিলেন বলে পরম্পরায় প্রকাশ।

তিন-গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হলেও মসজিদের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য ও অলঙ্করণে মুঘল রীতির স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। ভারবহনকারী বীম বা পিলার বিহীন ভবনটিতে ৪২ ইঞ্চি প্রশস্থ দেয়াল তৈরি করে ভার বণ্টন করা হয়েছে। সেই সাথে প্লাটফর্ম থেকে মাটির নীচ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দেয়াল তুলে এর দৃঢ়তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ওপরের দেয়ালের প্রস্থ যদিও ৪২ ইঞ্চি, কিন্তু বর্তমান ভূমি লেবেলের (ইজিএল) ওপরে প্লাটফর্ম লেবেল পর্যন্ত দেয়ালের প্রস্থ ৭৪ ইঞ্চি, ভিত্তিতে তা আরও বেশি।

পূর্ব-পশ্চিমে ৬২ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং উত্তর-দক্ষিণে ৬৯ ফুট ২ ইঞ্চি আয়তনের আয়তাকার মসজিদ কমপ্লেক্সটিকে ‘সিড়িসহ প্রবেশপথ’, ‘খোলাচত্বর’ এবং ‘মূলভবন বা নামাজঘর’ এই তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়। ৯ফুট বাই ২১ ফুট আয়তনের দুই গম্বুজবিশিষ্ট প্রবেশপথটি আলাদা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থাপত্য । মূলভবনটি পূর্ব-পশ্চিমে ২৫ ফুট ১১ ইঞ্চি প্রশস্থ। প্রবেশপথ, খোলা চত্বর ও মূলভবন একই প্লাটফর্মের ওপর অবস্থিত। বর্তমান ভূমি লেবেল (ইজিএল) থেকে স্থানভেদে সাড়ে ৩ ফুট থেকে সাড়ে ৪ ফুট গভীর ভিত্তির ওপর ৫ ফুট সাড়ে ৩ ইঞ্চি উঁচু প্লাটফর্মের ওপর মসজিদটি স্থাপিত। প্লাটফর্ম থেকে ছাদের উচ্চতা ১৭ ফুট। ভিত্তিসহ পুরো মসজিদটিই চুন-সুরকির মর্টার এবং হাতে পোড়ানো ইট দিয়ে নির্মিত। ইটের আকৃতি বর্তমান কালের ইটের মতো হলেও ইটগুলো আদর্শমানের, সঠিকভাবে পোড়ানো এবং কঠিনত্ব গুণ সম্পন্ন। এর রং লাল এবং সুন্দর সুপরিস্ফুট কাদামাটির কণা দিয়ে তৈরি। ইটে কোনো অলঙ্করণ না থাকলেও মসজিদের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ইট কেটে তৈরি করা নকশা স্থাপন করা হয়েছে। অলঙ্করণে ইট কেটে কলস, ঘণ্টা, ডিশ, বাটি, আমলকি, পদ্ম ইত্যাদি আকৃতি দেয়া হয়েছে। যদিও পুরো মসজিদেই কমবেশি অলঙ্করণ রয়েছে, তবে প্রধান প্রবেশপথ, পূর্বদিকের দেয়াল এবং মিহরাবে বেশি নকশা স্থাপন করা হয়েছে। দেয়ালের কোথাও আস্তরণ করা হয়নি। দরজা-জানালা কাঠামো নির্মিত হলেও দরজা-জানালা নির্মিত হয়নি। প্রবেশ পথ ও মূল প্রবেশদ্বারের খিলানে এবং মূল ভবনের ভেতরের ভারবহনকারী খিলানে লোহার আংটাসহ রিং দেখা যায়। সম্ভবত বাতি ঝোলানোর জন্য এই আংটাগুলো স্থাপন করা হয়েছিল।
(চলছে)

নাওযাত্রা-৩

তিন নম্বর কিস্তিটি লেখার আগে এক নম্বর কিস্তির একটি প্রশ্নের জবাব দিয়ে নেই। নজরুল ভাই এবং মুস্তাফিজ ভাই জানতে চেয়েছিলেন বারিকের টিলাটি কোথায়? ভারতের মেঘালয় থেকে নামা সহ্‌ইয়ং নদীটির প্রধান শাখা জাদুকাটা বাংলাদেশে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার যে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছে, ওই সীমান্তে একটি টিলা আছে, তার নাম বারকির টিলা বা বারেকের টিলা বা বারিকের টিলা। ঢাকা থেকে গেলে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে তাহিরপুর, সেখান থেকে নৌকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর পার হয়ে পৌঁছুতে হবে বারিকের টিলা। বন বিভাগের সংরক্ষিত বন এবং বিডিআর-এর চৌকি আছে এখানে। এক দিকে মেঘালয় (এই টিলাটিও মেঘালয়ের অংশ, তবে ছোট), অন্যদিকে নদী এবং জেগে ওঠা চর। আর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করছেন জৈন্তা আদিবাসীরা। সময় মতো যেতে পারলে কোনো আদিবাসী উৎসব-ও হয়তো দেখে আসতে পারবেন (যেমনটি আমরা পেরেছিলাম)। কয়েক ঘর মুসলমানও আছে, দু'এক ঘর খাসি বা অন্য আদিবাসীও পেতে পারেন। জুঁটিরা কয়েকটি জিনিস মনে রাখবেন, প্রথমত প্রায় সারা বছর বৃষ্টি হয়, সুতরাং বৃষ্টিরোধক জুতা, রেইনকোট এবং ছাতা নিয়ে যাবেন। রেইনকোট নিলেও ছাতা নেবেন, নইলে ছবি তুলতে পারবেন না। টিলায় ওঠার সময় সাবধানে উঠবেন। বনে যাবেন, যদিও অনেকেই নিষেধ করবে। নদীতে নামবেন না, ছোট নদী মনে হলেও অনেক গভীর। চরেও নামবেন না, চোরাবালি আছে নিশ্চিত, আমরা হাতে নাতে প্রমাণ পেয়েছি। অবশ্যই রোগজীবাণু প্রতিরোধক সাথে নিয়ে যাবেন।

আমার ফেসবুকের এই অ্যালবামে জাদুকাটার কয়েকটা ছবি আছে, তবে বৃষ্টির কারণে এবং ব্যাটারিতে চার্জ না থাকার কারণে বেশি ছবি তুলতে পারিনি।

নাওযাত্রা-৩
সকাল হলো বাথরুমের তাড়ায়, নৌকাটিতেই সারলাম। নাস্তা হলো না ক্ষুধা নেই বলে, গোসল করলাম মধ্যনগর থানায় (মানে পুলিশস্টেশনে)। ছবি তুললাম, একটা মাথাল কিনলাম। পার্থরা স্কুলে সমাবেশ করলো, স্কুল প্রাঙ্গনে হাজার হাজার গাছের ভেতর বৃক্ষরোপন করলো। নাটক শুরু হলো নৌকা চলতে শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই।

নৌকায় লাগানো ব্যানারের বাঁশের খুঁটির সাথে ইলেকট্রিক তারের ছোঁয়া লেগে তড়িৎস্পৃষ্ট হয়ে একটি ছেলে নদীতে পড়ে গেল। আমরা ছিলাম পাশের নৌকাতেই। আমাদের নৌকানেতা জাহাঙ্গীর ভাই বাঁশ, বাঁশ বলে চেঁচাতে লাগলেন, আমি আর বিশ্ব বাঁশ খুঁজতে লাগলাম। আর আমাদের তিন উন্নয়নজীবী (ফারহাত, মর্তুজা এবং স্বপন) এবং তাদের ভাড়ায় আনা ক্যামেরাম্যান সুমন খুললেন তাদের ক্যামেরাগুলো। সবাইকে হতাশ করে, বাঁশের সাহায্য ছাড়াই ছেলেটি সাঁতরে নৌকায় উঠে এলো।

নাটকের দ্বিতীয় অংক শুরু হলো বৃষ্টি শুরু হবার পর। বৃষ্টি শুরু হলে স্বভাবতই আমি সদ্য কেনা মাথাল বের করলাম বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। ৫ সেকেন্ড বড়জোর ৬ সেকেন্ড হবে। তার বেশি এক ন্যানো সেকেন্ড-ও না। আমার মাথা থেকে মাথাল উধাও। চলে গেছে মর্তুজার হাত ঘুরে ফারহাতের মাথায়। শুরু হলো বাংলা সিনেমার বৃষ্টিভেজা নৃত্য- আমি এটা পড়ে ছবি তুলবো, আমি এটা পড়ে ছবি তুলবো। এক নায়িকা দুই নায়ক। একজন মাথায় পড়িয়ে দিলেন (যেন মাল্যদান করলেন), অন্যজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকার রেলিংয়ে ব্যাঙঝোলা হয়ে নায়িকার ছবি তুললেন।

ও, বলতে ভুলে গেছি, প্রতি নৌকাতেই তিনটি করে লাইফ জ্যাকেট দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ছেলেটি নদীতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য মঞ্চস্থ হওয়ার পরপরই নায়ক-নায়িকারা কস্টিউম বদলের সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়লেন।

বাদশাগঞ্জ বাজার। সেলবরষ ইউনিয়ন পরিষদ ও সরকারি খাদ্যগুদামের চত্বরেই অবশ্য আমাদের অবস্থান। এখানে একটা নৌকায় হাটের ছবি তুললাম। মানে নৌকা নৌকাতেই হাট বাজার। নৌকাতেই দোকান, খদ্দের-ও আসেন নৌকা করেই।

ধর্মপাশা বাজার। এখানে লোকজন অনেক দেখা গেল। কয়েকটা কামারের দোকানে কাজের ছবি তুললাম।

রাতে নৌকাতেই থাকলাম, কিঞ্চিৎ অমৃতপানের পর নাসিকা গর্জন।
(চলছে)

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া মসজিদ সংরক্ষণ

ইন্দো-ইসলামিক রীতিতে তৈরি মসজিদটিকে মুঘল আমলের তৈরি বলে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি নির্মিত হয় আরও অনেক পরে। মসজিদের গায়ে খোদাই করা তারিখ অনুসারে মসজিদটি নির্মিত হয় বঙ্গাব্দ ১৩১৭ সালে। স্বভাবতই প্রথমে আমরা মনে করেছিলাম, মসজিদটি হয়তো ১০০ বছরেরও কম সময় আগে নির্মিত। কিন্তু নির্মাণকারী মেহের বক্শ সরকার সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে এবং মসজিদটির দেয়ালের কিছু অংশ খোলার পর বেরিয়ে আসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। প্রথমত, মসজিদের নির্মাতা মেহের বক্শ সরকারের কবরেও তার মৃত্যুর তারিখ খোদাই করা আছে ১৩১৭ সাল। মেহের বক্শের মৃত্যুর সময়েই যদি মসজিদটির বেশির ভাগ কাজ শেষ হয়ে গিয়ে থাকে (যেমনটি স্থানীয় মানুষেরা আমাদের বলেন), তবে তা কোনোভাবেই ১৩১৭-এ নির্মিত হতে পারে না। মেহের বক্শ এর পরিজনরা আমাদের জানান, মেহের বক্শ মসজিদটি নির্মাণ করার জন্য মুর্শিদাবাদ থেকে স্থপতি নিয়ে আসেন। কিন্তু নির্মাণ কাজ সমাপ্তির আগেই স্থপতি মারা গেলে মসজিদের কাজ থেমে যায়। বেশ কয়েক বছর স্থগিত থাকার পর, মেহের বক্শ স্থানীয় নির্মাতাদের নিয়ে নিজেই মসজিদের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করেন। কিন্তু শেষ করার আগেই তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। এ পর্যায়ে আরো কয়েক বছর মসজিদের নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকে। মেহের বক্শের ছোট ভাই কয়েক বছর পর মসজিদটি নির্মাণের জন্য আবারো উদ্যোগ নেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, নির্মাণকাজ সমাপ্ত না করেই তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। স্থানীয় মানুষ এবং মেহের বক্শ-এর পরিবারের কাছে এভাবে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, এই মসজিদটি সম্পন্ন হবার নয়, কেননা এটিতে অশুভ ছায়া রয়েছে। কাজেই শতাধিক বছর ধরে পরিত্যক্ত হয়ে জনমানসের আড়ালে বৃক্ষ ও শ্বাপদের আশ্রয়ে পরিণত হয়। এই তথ্য থেকে মনে হয়, মেহের বক্শ-এর মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগেই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। অপর দিকে, সংরক্ষণ কাজের অংশ হিসেবে ফাটল ধরেছে এবং আলগা হয়ে পড়েছে এমন একটি অংশকে আমাদের খুলে ফেলতে হয়েছে। দেয়ালের যে অংশটি খোলা হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান মসজিদের ১১ ইঞ্চি গভীরে অলঙ্করণবিহীন হুবুহু একই নকশার একটি স্থাপনা। পুরো মসজিদেই এই ১১ ইঞ্চি দেয়ালের ভেতরের স্থাপনাটি আছে, যা পূর্ববর্তীকালের নির্মিত। শুধু তাই নয়, এই ভেতরের স্থাপনাটির ইটের আকৃতি, গঠন এবং মর্টারের সাথে পরবর্তীতে নির্মিত ইটের আকৃতি, গঠন ও মর্টারের পার্থক্য রয়েছে। স্পষ্টই এই দুয়ের নির্মাণকালের পার্থক্য বোঝা যাচ্ছে। তবে তা কতো আগের তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এই তথ্যসমূহ মিলিয়ে আমরা মসজিদটির প্রাক্কলিত বয়স নির্ধারণ করেছি, ১২০ বছর। তবে (ব্যয়বহুল বলে) বয়স নির্ধারণে কার্বন-১৪ বা থার্মালুমেনিসেন্স এই ধরনের কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করা হয়নি।

মেহের বক্শ-এর মৃত্যুর পর যথাযথ উদ্যোগের অভাব এবং প্রচলিত মিথ ও ভীতির কারণে মসজিদের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়নি অথবা এটিকে কোনো রকম যত্ন-আত্তিও করা হয়নি। অযত্ন-অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে মসজিদের বিভিন্ন অংশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমগ্র দেয়াল জুড়ে পাকুড় ও অন্যান্য জাতের গাছপালা, মস, শৈবাল, ছত্রাক রয়েছে, নোনা ধরেছে এবং ফাটল রয়েছে। স্থানীয় লোকজনের মসজিদ উপকরণের অপব্যবহার এবং খোঁচাখুঁচি ও ঝাঁকানোর কারণেও মসজিদটি তিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় ইট ক্ষয়ে গেছে, আলগা হয়ে গেছে, কোণা ভেঙ্গে গেছে অথবা ফেটে গেছে। ছাদের লেবেলে কয়েকস্তর ইট খুলে পড়ে গেছে। মর্টারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় লক্ষনীয়। অনেক জায়গায় মর্টার ক্ষয় হয়ে ইট খুলে পড়েছে। গাছের শিকড়ের কারণে প্রায় সব অলঙ্করণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং যেগুলো টিকে আছে তা-ও দেয়াল থেকে আলগা হয়ে আছে। অলঙ্কৃত স্তম্ভগুলোতেও ফাটল ধরেছে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব কোণে স্তম্ভসহ দেয়ালের ওপর থেকে নিচ বরাবর লম্বালম্বি ভাবে ফেটে গেছে।

ইট ও মর্টারের ফাঁকে এবং দেয়ালের ফাটলে বসতি স্থাপন করেছে সাপ, বিছা, চিকা, শেয়াল, খাটাস, মাকড়সা, টিকটিকি, পিঁপড়া ও নানা ধরনের পোকামাকড়; আর স্কুইঞ্চগুলোতে কয়েকটি মৌচাক।

এই রকম একটি অবস্থাতেই আমাদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং স্থানীয় জনসাধারণের উদ্যোগে বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ পদ্ধতিতে পুনঃনির্মিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি। বাংলাদেশে বিজ্ঞানসম্মত প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে ঐতিহ্যবাহী ভবন সংরক্ষণের প্রাথমিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে এটি একটি। বলা বাহুল্য অপর উদ্যোগগুলোও আমাদেরই। (চলবে)

নাওযাত্রা-২

টেকেরহাটের কয়লাশ্রমিক; ছবি: বিশ্বজিৎ দাস

১২ জুলাই ২০০৮
নাওযাত্রার দ্বিতীয় দিন

এক.
পরিকল্পনা মতো সময়ে শুরু করা যায়নি। নাস্তা খেতে পারেননি অনেকেই (নাস্তার স্বল্পতা)।
দুই.
টেকেরহাট বড়ছড়া বাজারে প্রমিত বাংলায় একটি সমাবেশ করা হলো, আয়োজকেরা ছাড়া উপস্থিতি বড়জোর ২০, উকিঁঝুকিঁ-জিজ্ঞাসা আরো ১৫-২০ জন। বক্তব্য স্থানীয় মানুষের বিরোধী, স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের প্রধান কাজ ছড়া (ঝর্ণা) থেকে কয়লা আহরন, আয়োজকরা মনে করে, এই কাজ অবৈজ্ঞানিক ও মানবেতর। স্থানীয় একজন শ্রমজীবী নারী বললেন, "তুমরার এই কতার লাগিই তো বিডিআর আমরারে দৌড়ায়"।
তিন.
দুপুরের খাবার আগের মতোই দেরিতে এবং অর্ধসিদ্ধ। কেউ কেউ বললেন, আয়োজকরা চাচ্ছেন- কিছু কিছু নাওযাত্রী বিদেয় হোক। এটিএন বাংলার সাংবাদিক ভাই বরাবরের মতো খাদ্যস্বল্পতায় ক্ষুব্ধ।
চার.
আজকেও ব্যাপক ফটোসেশন চললো। ও বলতে ভুলে গেছি, বড়ছড়ায় ফারহাত বললেন, খাসিয়া রাজার ছেলেও তার ভাই, ভাস্তেও তার ভাই। রাজকীয় তৈলমর্দন আর কাকে বলে?
পাঁচ.
সাড়ে দশটার দিকে নৌকা এল মধ্যনগর, কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম তিনজনের মালপত্র আর চারজন লোক উধাও। (অ্যাকশনএইডের ফারহাত, ইনসা (বাউপ)-এর মর্তুজা, রুট-এর স্বপন)। তারা তিনজন থাকবেন চেয়ারম্যানের বাংলোতে। খাবারের ছবি না তোলার ঝাড়ি সুমন সম্ভবত দ্রুত ভুলবে না, আপার ঘুমানোর (?) ছবি তোলার জন্য খোলা ক্যামেরা হাতে সেও দৌড় দিল তাদের তিনজনের পিছু পিছু।
ছয়.
রাতে খেলাম বরিশাল হোটেলে, আগের দেড়দিনের তুলনায় অমৃত।
সাত.
তারপর সত্যিই অমৃত খেলাম, রেড লেবেল। নৌকার সামনে নদীর পাড়ে বসে রাত (অথবা সকাল) ছয়টা পর্যন্ত তর্কাতর্কি (অথবা মাতলামি) চললো। রাতটা ভালই কাটলো।
(চলছে)

Saturday, November 14, 2009

হায় নাওযাত্রা!!!



১১ জুলাই ২০০৮
নাওযাত্রার প্রথম দিন

এক.
পরিকল্পনা মতো আমরা সময় মতোই পৌছুঁলাম। আমরা ভেবেছিলাম সত্যি সত্যি বুঝি মানুষের জন্য আমরা কিছু করতে এসেছি, প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ঢেউয়ে তাই মনে হচ্ছিলো, হয়ে গেলো বোধ হয়। প্রথম দিনেই চার সেট জামাকাপড় ভেজালাম এবং এক সেট হারালাম। পরে অবশ্য বুঝলাম এটাও এক ধরনের 'উন্নয়ন পিকনিক', শুধু ন্যায্য বা স্থায়ীত্বশীল শব্দগুলো যুক্ত হবে।
দুই.
তাহিরপুরে জৈন্তিয়া ছিন্নমূল সংস্থার একটা সাইনবোর্ডে কেয়ার এবং ইইউ-এর নাম দেখলাম, এই প্রোগ্রামেও তারা আছে, ভালই কামাচ্ছে।
তিন.
বারিকের টিলা বাংলাদেশের খুবই সুন্দর জায়গাগুলোর অন্যতম, বিয়ের আগে প্রত্যেক প্রেমিক জুটির এখানে যাওয়া উচিৎ। বিয়ের পরেও (যদি) প্রেম থাকে, যেতে পারে।
চার.
দুপুরের খাবার এলো সাড়ে পাঁচটায়-ছয়টায়। এটিএনবাংলার এক সাংবাদিক খাদ্যস্বল্পতায় দারুন ক্ষুব্ধ হলেন।
পাঁচ.
যদিও থাকার কথা ছিল নৌকায়, জেনারেটর সমস্যায় থাকতে হলো বাংলোয়। ভালো ঘরগুলো অবশ্য দেয়া হলো অথবা নিলেন অ্যাকশনএইডের ফারহাত আর বাউপ-এর মর্তুজা।
ছয়.
রাতের খাবারে আবার অর্ধসিদ্ধি, আবার স্বল্পতা, আবার ক্ষোভ। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন ফারহাত, তার ক্যামেরাম্যান সুমনের ওপর, "ক্যানো আমার খাবারের দৃশ্য ভিডিও করা হচ্ছে না?" বৃষ্টির জন্য ক্যামেরা ঢুকিয়ে রেখে বেচারা মারাত্মক অপরাধ করে ফেলেছে। ফারহাতের দ্বিতীয় ক্ষোভ, তার ঘরের প্লাগপয়েন্ট গোল গোল, অথচ তার ল্যাপটপের ব্যাটারিপ্লাগ চ্যাপটা। আর তার তৃতীয় ক্ষোভ, খাবার রান্না ভাল হয়নি। বোঝো ঠেলা!!!

(চলছে)

* ঠিক এক বছর আগের ঘটনা লিখছি এটা। বাংলাদেশের সবচেয়ে দায়িত্বশীল এনজিও অ্যাকশনএইডের একটা আয়োজন ছিল- নৌকায় করে পুরো হাওর এলাকা ঘোরা এবং চলতি পথে স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলে হাওর অঞ্চলের মানুষের মঙ্গামুক্তির জন্য "স্থায়ীত্বশীল" উপায় খুঁজে বের করা। নাওযাত্রার সেই মিছিলে আমিও ছিলাম, ডায়েরীতে লিখে রাখা নোটগুলোই তুলে দিলাম। কারণ সামনেই বাসা বদল করবো এবং ডায়েরিটাও যথারীতি হারিয়ে যাবে। দু'একদিনের মধ্যেই তুলে দিবো তেল গ্যাস রক্ষা আন্দোলনের লং মার্চের মশকরাগুলো।