Wednesday, July 15, 2009

মহররম

কুফা এক নগরী ছিল দজলার পাড়ে
নবীর নাতিরে উম্মত দাওয়াত করে।
সোস্যালিস্ট ছিল না মোটে হোসেন হাসান
পুঁজির প্রোডাক্ট ওসব আল্লাহর দান।
তবু শুধু দাওয়াতী এনে মাবিয়ার পোলা
দজলার পানি বান্ধে দাড়িমুখী ঠোলা।

৭৭২ পর্বের দীর্ঘ উপন্যাস : ৬ষ্ঠ কিস্তি

রঙপুকুরের নাম কেন রঙপুকুর হলো, সেই প্রশ্নের জবাব গত ১০ বছরে আমি পাইনি। তবে এই পুকুরের ঘাট রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে যদি “ঘাটের কথা” বলতো, তবে ঘাটের কথা গল্প না হয়ে নির্ঘাত ৭৭২ খণ্ডের উপন্যাস হতো! এই পুকুরের পাড়েই ইউনিভার্সিটির ছাত্র সংসদ ভবন, মেডিক্যাল সেন্টার, পরিবহন অফিস এবং ফজিলাতুন্নেসা হলের অংশবিশেষ। শিক্ষার্থীদের আড্ডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সুপারিতলা, এই পুকুরের পাড়েই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রেমাপ্রেম সম্যক সম্মোহে আর কোন্ জায়গা এতো বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে?
এই পুকুরের পাড়েই জাকসু ভবন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সেটি তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে এখানকার একটি ঘর খুলে তাকে রাখা হয়*। আর একটি ঘর, যেটি জাকসুর মূল সভাকক্ষ- কোনো গুরুত্বপূর্ণ সভাটভা হলে ওটাকে খুলে দেয়া হয়। দু'তিন বছর পর পর এমন সভা হয়ে থাকে।
নূরুল কুদ্দুসের আহ্বানে শঙ্কু-শমী বিষয়ক রুদ্ধদ্বার সভার জন্য এই জায়গাকে বেছে নেয়া হলো। দুই-তিন বছরের আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য ওই ঘর পরিষ্কার না করে আমাদেরকে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে একদিন ঝাড়ু দেয়ার দায়িত্ব দিলেও মনে হয় এর চেয়ে কম খাটুনি যেতো। দেড় দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান শেষ হলে এলেন কমরেড কুদ্দুস। ডেইরি ফার্মে রাজ্জাকের দোকানে অর্ডার দেওয়া হলো খাবারের জন্য। নিয়মিত খাবারের চেয়ে একটু বেশি উন্নত বলা যায় সেটাকে। নারী কমরেডরা কয়েকদিন ধরে আচার-টাচার কি কি সব তৈরি করে রেখেছেন, সেগুলোর গন্ধও পেলাম।
আলোচনা শুরু হলো। মানুষের মানবিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এবং কমরেডদের পারষ্পরিক সম্পর্ক নিয়ে শিবদাসঘোষীয় আলোচনা শুনতে শুনতে ঘুম এসে যাচ্ছিলো। বিশেষ করে আমি ঘটনার মাথামুণ্ডু কিছুই জানি না। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশগ্রহণের যে বিশেষ ব্যাজ লাগে তা-ও আমার ছিল না। কেবল ঝাড়া-মোছার কাজে ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণেই বোধহয় ঐ বৈঠকে আমি অংশ নেবার সুযোগ পেয়েছিলাম। তা না হলে বিকেলে মূল আলোচনা শুরুর আগেই এমন একটা আবেগ-বিধ্বংসী ঘটনা ঘটতো না।
সায়েম সৌগত দিলখোলা একজন মানুষ। যখন যেটা বোঝেন সেটা করতে বা ঐ বিষয়ে নিঃসঙ্কোচে কথা বলতে তার বাধে না। মেধাবী এবং সরল- এই দুয়ের অদ্ভুত সমন্বয় তার মাঝে জায়গা নিয়েছে। শঙ্কুর স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, একই ধরনের চর্চার সাথে শৈশব থেকেই থাকার কারণে শঙ্কু এবং সৌগত-কে আমরা হরিহর আত্মা বলেই মনে করতাম। শঙ্কু-শমীকে খুব সহজেই শঙ্কু-শমী-সৌগত বলা যেতো। কিন্তু তা হলো না।
সৌগত এমন একটি ঘটকালি টাইপ অনুষ্ঠানের জন্য বেশ উৎসাহী ছিলেন। তার ধারণা ছিল, কমরেড কুদ্দুস শঙ্কু এবং শমীকে হাত ধরে বলবেন- "তোমার হাতে ওকে সপে দিলাম"।- এমন একটা আমেজ নিয়ে রীতিমতো সেজেগুজে রঙপুকুরের সামনে এসে হাজির হলেন সৌগত।
পুকুরের ঘাটে আমরা যখন আড্ডা দিচ্ছি, সৌগত-ও আমাদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলেন। কেন্দ্রীয় কমরেড নূরুল কুদ্দুস ক্যাম্পাসের কমরেড ন্যান্সিকে বললেন, ডাকো সবাইকে। ন্যান্সির আহ্বানে আমরা সবাই একে একে ঢুকে যেতে থাকলাম প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে ঠাসা ভবনের কিছুটা পরিচ্ছন্ন ঘরের ভেতরে।
"তুমি না"
সৌগতকে আটকে দিলেন ন্যান্সি। কেন সে নয়? শঙ্কু-শমী বিষয়টি তো তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না! তো সৌগত নয় কেন?
"কারণ সৌগত-র রুদ্ধদ্বার ব্যাজ নেই।"
সকলেই কমরেড কুদ্দুসের দিকে তাকালেন, কারণ একমাত্র তিনিই বিশেষ ক্ষমতাবলে সৌগতে ঢোকার অনুমতি দিতে পারেন। কুদ্দুস ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন, ন্যান্সি দুঃখপ্রকাশ করলেন সৌগতের কাছে।
সৌগতের জন্য এই অনধিকার শাপে বর হয়ে এলো। সকাল থেকে আরো একজন অনাহূত ছিল আমাদের মাঝে। শিস নামে ফার্স্ট ইয়ারের ওই মেয়েটি বসে থাকতো রঙপুকুরের ঘাটে। সভাবিরতির আড্ডাবাজিতে সে আমাদের সঙ্গে মেতে উঠতো। আর আমরা যারা ধূম্রসেবী, তারা বেরিয়ে এলে একটু ওর সাথে খুনসুটি করে যেতাম।
বিকেলের মূল সভা শুরু হলে, সবাই যখন রুদ্ধদ্বার, সৌগত তখন শিসের জন্য তার দ্বার খুলে দিলো। রঙপুকুরের ঘাটে তাদের এই স্বেচ্ছা-নিঃসঙ্গতা কয়েক বছর চললো।
* মাহবুব মোর্শেদ একবার অসুস্থ হয়ে ওখানে মাসকাল ছিল, ওকে ধরলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈশবিহারের কিছু গোপন খবর জানা যাবে।

৭৭২ পর্বের দীর্ঘ উপন্যাস : ৫ম কিস্তি

নতুন সমস্যাটা যে নতুন না, এটা বুঝতে আমার প্রায় ছয় মাস লেগে গেলো। এমনকি বিশেষ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে যখন আবেগের সকল ধরনের প্রকাশ ঘটে গেল, তখনও আমি বুঝতে পারিনি এই স্বতঃস্ফূর্ত (!) আবেগ প্রকাশের হেতু কী? রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশগ্রহণের অনুমতি পেলেও বৈঠকে কথা বলার অনুমতি মেলেনি -এক অর্থে। (রূপ মেলে তো রূপাই মেলে না!)। আরো পরে, যখন আমি নিজেই সমস্যায় পড়ে গেলাম, তখনও বুঝিনি এখানে কোনো সমস্যা আছে। আমি আছি আমার নিজের ধান্দায়, ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছেলে যেভাবে থাকে। কিছু আড্ডাবাজি, কিছু ঘোরাঘুরি, কিছু পড়াশোনা, কিছু রাজনীতি, কিছু নারী-প্রীতি ইত্যাদি। হ্যা, সঙ্গটা ভালো ছিল, সঙ্ঘটাও।

শঙ্কু মহারাজকে দিয়েই সমস্যার শুরু বলে আমার জানা। পরে অবশ্য জানলাম, এটা যুগ-যুগান্তরের সমস্যা! অ্যাডাম-ঈভের সময়কার। ব্রেখট তো বলেই গেছেন, পৃথিবীতে মৌলিক কিছু করে থাকলে সেটা করেছে অ্যাডাম আর ঈভ, বাকী সবই অ-মৌলিক। কিন্তু আমার কাছে তো ইউনিভার্সিটি একটা নতুন জায়গা, যা দেখি নতুন লাগে। ভেবেছিলাম, এটাও একটা নতুন ব্যাপার।

অ্যাডাম-ঈভ কী করেছে জানি না, তবে মহারাজ মহাপাপ করেছে, শুনলাম। পাপ হলো- তিনি একটা মেয়ের সঙ্গে বেশি মিশছেন। একই চিন্তার, একই সংগঠনের, একই বিভাগের একই ইয়ারের একটি মেয়ের সঙ্গে শঙ্কু মহারাজকে বেশি দেখা যাচ্ছে। সমস্যাটা আরো গভীর বলে মনে হলো, যখন প্রকাশ পেলো মেয়েটা একই ধর্মীয়ও বটে।

ঘটনা আর কিছু না। ঢাকা থেকে ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় কমরেড নূরুল কুদ্দুস এসেছিলেন পাঠচক্র করাতে। তার চোখ তো চোখ না, একেবারে শকুনের চোখ; বহুদূর থেকেও তিনি ঠিকই বুঝতে পারেন কোথায় কী হচ্ছে। শ্রবণ তার বাদুরের মতো, সাহস বাঘের মতো, কিন্তু চলাচল করেন বেড়ালের মতো- সন্তপর্নে। তিনি ঠিকই বুঝলেন।

-"শঙ্কু আর শমীকে সবসময় একসাথে দেখা যাচ্ছে কেন?"

ক্যাম্পাসের কমরেড বললেন, ওরা তো একসাথে পড়ে তাই।

কমরেড কুদ্দুস বললেন, না! ওরা তো একসাথেই এলো। ছেলেমেয়ে তো এক হলে থাকে না।

ইউনিটের কমরেড বললেন, ওরা এক সাথে ক্লাস করে এসেছে তো, তাই।

কেন্দ্রীয় কমরেড বললেন, না। কাভি নেহি। এর মাঝে ওরা একসাথে বেরিয়েও গেছে।

ইউনিটের কমরেড বললেন, কই আমি তো দেখিনি!

কমরেড নূরুল কুদ্দুস বললেন, সাবধান, আরো সাবধান হতে হবে তোমাদের। এখনই বেখেয়াল হলে চলবে? আমরা ওদের বাবার বয়সী, ওরা তো আমাদের ছেলেমেয়ের মতো। ওদের ভালোমন্দ তো আমাদেরকেই দেখতে হবে। ডাকো রুদ্ধদ্বার সভা, বিষয়টা সুরাহা হওয়া দরকার।

৭৭২ পর্বের দীর্ঘ উপন্যাস : ৪র্থ কিস্তি

ক্যাম্পাসে গিয়েই আমি একটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম, বলা বাহুল্য একটি বামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে। বাম হইলে কেন জানি, পিতামাতাবোনভ্রাতাবন্ধুস্বজন সবাইরে বাম বানাইতে ইচ্ছে করে। আমিও সেই সুবাধে আমার শৈশবের সব বন্ধুরে বাম বানানোর প্রজেক্ট হাতে নিলাম। ঘনিষ্ঠতম বন্ধু হিসেবে আলম-কেও বাম বানালাম, কিন্তু পীরের নাতি বাম হইলেই কী আর না হইলেই কী! ওর ধান্দা কীভাবে জাহাঙ্গীরনগরের কথা বইলা মানিকগঞ্জ যাবে। তবুও আমার সঙ্গে দেখা হলে ওর ডায়লগ থাকতো- "তোমাদের সংগঠনের খবর কী? থুক্কু আমাদের সংগঠনের খবর কী?" এই জাতীয়।

এইবারে যখন প্রেম, নারী এবং রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে ওর সাথে কথা বলছিলাম, ও সাথে সাথে ব্যাপারটাকে রিলেট করে ফেলতে পারলো। "ও! এই বিষয়েই না গত ফেব্রুয়ারিতে একবার কী ঝামেলা হইছিলো, তোমাদের সম্মেলনের সময়, থুক্কু আমাদের সম্মেলনের সময়?"

হ্যা, যদিও সংগঠনের সম্মেলন প্রতি বছরই হয় না, কিন্তু হবার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু মীনার জন্মদিন চার বছরে একবারই আসে। ফলে একটি সন্ধ্যা ওর সাথে কাটাবার ইচ্ছে হয়েছিলো আমার। ইচ্ছেটা একসময় তাড়নায় এবং শেষ পর্যন্ত জেদে রূপ নেয়- আমি যাবোই। কমরেডরা যতই 'না' বলুক, সংগঠনের গতি যতই বাধাপ্রাপ্ত হোক- বের হবার, বেড়ে ওঠার আকাঙ্খাকে শৃঙ্খলিত করে বনসাই হবো না আমি! ইউনিটের কমরেডকে ব্যাপারটা জানাই আমি- আসাদ ভাই, কটা দিন আপনার পাশে থাকতে পারবো না।

শুনে তিনি রেগে যান। জন্মদিন? সম্মেলন রেখে জন্মদিন? এবং অতঃপর জন্মদিন বিষয়ে লেনিনের কোনো এক সমালোচনা 'নিজের ভাষায়' শুনিয়ে দেন, লেনিনের প্রবন্ধটি যোগাড় করা গেলে সম্মেলনের পর এ বিষয়ে একটা পাঠচক্র করা হবে।

আসাদ ভাইকে পাত্তা না দিয়ে আমি ব্যাগ গোছাতে থাকি। কমরেড জি.এস.-এর সঙ্গে দেখা করতে তার হলে যাই। "অঞ্জনদা' চললাম"।

তিনি কিছু বলেন না প্রথমে। এবং যখন বলেন তখন বলেন, কিছু বলবো না আমি। সিদ্ধান্ত তোমার।

বরং আমার সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয় এমন একটি গল্প শোনান তিনি। সেই কমরেডের গল্প, যিনি পরম ভালবাসায় সংগঠনের কাজে এমনি মিশে গিয়েছিলেন, কাজ করতে করতে পার্টি অফিসেই তিনি মারা গেলেন। মজার ব্যাপার হলো মরার এগারো মাস পর এক মহিলা এসে বললেন, কমরেড শরীফুল ইসলাম তার স্বামী, যিনি বছরের কয়েকটা মাত্র দিনই বাড়ি থাকেন। কমরেড শরীফের খোঁজ তিনি করতেন না, যদি তার শ্বাশুড়ি মৃত্যুপথযাত্রী না হতেন। কান্নাহীন, সম্ভবত বেদনাহীন, নির্লিপ্ত মিসেস শরীফ জানতে চান, বুড়িকে কিভাবে কমরেড শরীফের হারিয়ে যাওয়ার গল্প বলবেন।

অঞ্জনদা' গল্প বলেন হাসিমুখে; কিন্তু ভরাট গলায়, কান্না জমানো। আমি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করি। সূর্য ডুবছে আনমনে। আমি সেন্ট্রাল মাঠে শুয়ে ভাবি, যাবো? শেষ শীতের হাওয়া গলার ভেতরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে। যাবো? দূরে দিগন্তের কালশিরা- যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। যাবো?

মীনাই সব কিছু নয়। সব হলেও- হারাতে ভয় নেই। জন্মদিন কিছুই না, বছর বছর আসে। একটা লাল সন্ধ্যা, লাল পতাকার চেয়ে লাল নয়। আর ইচ্ছে? কিছু ব্যক্তিক ইচ্ছে, ব্যক্তিবাদিতা বাদ না দিলে বিপ্লব হয়? উই শ্যাল ওভারকাম সামডে...।

পথে পথে শত শত ঘরে ফেরা মানুষের মিছিল ভাবনার পথ বদলে দেয়। মানুষ- শ্রমজীবী মানুষ; মেহনতী। দিনভর প্রাণান্ত খেটে যায়, জীবনভর যুদ্ধ করে যায়। তারপর জীবনের যুদ্ধটা অসমাপ্ত রেখেই প্রকৃতি তাকে ছুটি দেয়, মাইনে বকেয়া রেখেই। ইতিহাসে তার নাম থাকে না, কারণ জীবনে তার সুখ থাকে না।

আকাশে তো আমি রাখি নাই মোর
উড়িবার ইতিহাস
তবু উড়েছিনু, এই মোর উল্লাস।

৭৭২ পর্বের দীর্ঘ উপন্যাস : ৩য় কিস্তি

সারাদিনের রাজনীতি শেষ করে মধ্যরাতে ঘরে ফেরে মাহবুব মোর্শেদ। প্রচণ্ড গরমে ঘরে বসে থাকাই যখন দায়, তখন সারাটা দিন রাজনীতির উষ্ণ মাঠে দিন কাটিয়ে ঘরে কই একটু রেস্টটেস্ট নিবে, তা না করে আরেকবার জনসেবা করতে হচ্ছে মাহবুবকে। ঐ দিন ও কী কী করেছিলো ঠিক মনে নেই আমার, সম্ভবত মাথায় পানি-টানি দিয়েছিলো, নোংরা ঘরটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা করেছিল, এইসব। মাহবুব ওই রাতটা আমাকে বলতে গেলে বাঁচিয়ে রাখে। সকালে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই।

দুটি বৃষ্টির আর পাঁচটি জ্বরের রাত কাটিয়ে বাড়ি থেকে বের হই। যাত্রাপথে যাত্রাবাড়িতে থামি আমার শৈশবের বন্ধু আলমের সাথে দেখা করার জন্য। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু কে?-এই প্রশ্নের জবাবে একসময় আমি ওর নামই বলতাম। বাংলাদেশের এক প্রভাবশালী পীরের নাতি ও। কথায় কথায় আধ্যাত্মিকতা আর রহস্যময়তা রাখতে পছন্দ করতো, ভাবের চর্চাও করতো। বিষয়টা ও পেয়েছিলো পারিবারিকভাবে। এই অতি ভাব আর রহস্যময়তার কারণে শেষ পর্যন্ত নিজের প্রেমটাকেও হারাতে হয়েছে আলমকে। কিন্তু এই হারানোটাকেও মধুর করে তুলেছে "বিরহ বড়ো ভালো লাগে" টাইপের বেশভূষণ আর আচরণের মাধ্যমে। "যাকে চাইলাম তাকে পেলাম না, আর অন্য কার কাছে যাবো?"-ইত্যাদি মার্কা কথাবার্তা আরকি! অবশ্য এইসব গল্প অনেক পরের। সেদিন যখন আলমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তখনও পর্যন্ত গল্পটা প্রেমের রহস্যেই ছিল, বিরহের রহস্যে ছিল না।

আলম যে মেয়েটাকে পছন্দ করতো সে থাকতো মানিকগঞ্জ। প্রায়ই 'জাফরের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি' বলে বাসা থেকে বেরিয়ে বাসে চড়ে আলম ঘুমিয়ে পড়তো। সাভার-নবীন গড়*-ধামরাই পেরিয়ে সে যখন ভুলে মানিকগঞ্জ চলে আসতো, তখন তার ঘুম ভাঙ্গতো। পীরের নাতি হিসেবে এইভাবে সে মিথ্যে না বলেও নিজের প্রেমের সাথে দেখা করে আসতে পারতো। কিন্তু পীরের নাতি না হওয়ার আমাকে প্রায়ই আলমদের বাড়িতে আলমের মায়ের কাছে মিথ্যে বলতে হতো। বিষয়টা অবশ্যই ওর প্রেম এবং জাহাঙ্গীরনগর গমন।

এইবার অবশ্য আলমের না, নিজের প্রেম নিয়েই এসেছি ওর কাছে। আমার প্রেম মানে আমি যে মেয়েটির প্রেমে পড়েছি বলে আমার সঙ্গী-সাথীরা মনে করছে সেই বিষয়টি নিয়েই ওর সাথে আলাপ করতে এসেছি। কারণ বিষয়টি নিয়ে খুব ঝামেলা হচ্ছে। ঝামেলা মানে চরম অবস্থা। আমি পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে পারিনি। খাওয়া-দাওয়াও বন্ধ প্রায়। কিন্তু ঘটনা হলো, আমি প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার ওপরে চেপেছে। আমার সাথীরা, এমনকি ঐ মেয়েটিও ভাবছে আমি প্রেমে পড়েছি। আমার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলো ভেঙ্গে যায় যায় অবস্থা।



* নবীন গড়-কে অনেকে ভুল করে নবীনগর লিখে থাকে।

৭৭২ পর্বের দীর্ঘ উপন্যাস : ২য় কিস্তি

বৃষ্টি শেষ করে আমি জ্বরে পড়লাম। ভুলেই গিয়েছিলাম, প্রচণ্ড জ্বরের কারণেই আমি ক্যাম্পাসের তুমুল আন্দোলন ফেলে বাড়ি চলে এসেছি। বাড়ির একটু বেশি স্বাস্থ্যকর পরিবেশে এসে ক্যাম্পাসে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম- এই কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। বৃষ্টিসঙ্গ কয়েকদিন স্বাভাবিকভাবেই বিছানায় থাকার অজুহাত এনে দিয়েছিল। বৃষ্টি সেরে যেতেই জ্বর ঝেকে বসলো। এমন জ্বর আমার বাপের জন্মেও আসেনি। আমার পুরো ক্যাম্পাস লাইফে কেউ আমাকে এতো অসুস্থ দেখেনি। অবশ্য এটাও দেখেনি তেমন কেউ- এক মাহবুব মোর্শেদ ছাড়া।

ক্যাম্পাস থেকে যেদিন এলাম, তার আগের দিন সন্ধ্যায় মাহবুবদের সঙ্গে দেখা। মাহবুবরা মানে ক্যাম্পাসের প্রভাবশালী এবং ত্যাগী নেতাদের কথা বলছি। রিকশা থেকে হলের গেটে নেমে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উঠলে কয়েকধাপ বেশি পেরুতে হবে, এই ভয়ে আমি উত্তর দিকের সিঁড়ির দিকে এগুতেই ওদের সামনে পড়ে যাই। মনিমোহন দাশগুপ্ত, আবু সাঈদ আকিজ, মাহবুব মোর্শেদ, ফারুক ওয়ারিদ প্রমুখ নেতা হলের বারান্দার বাঁধানো রেলিংয়ে বসে কর্মপরিকল্পনা করছিলেন। আমার এক হাতে পাউরুটি আর কয়েকটা ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, অন্য হাতে একটা সিরাপের শিশি।

ফারুক ওয়ারিদ আমাকে ডাকলেন- 'কই থাকো সারাদিন?'

-শরীর খুব খারাপ, সারাদিন ঘুমাইছি, কিছু খাই নাই। এখন উঠে ডেইরিতে গিয়ে খেলাম আর এই ওষুধ নিয়ে আসলাম।

আমি আমার হাতের ওষুধ আর রুটি ফারুককে দেখালাম।

- ঘুমাও, রোম যখন পোড়ে নিরো তখন বাঁশি বাজায়। ক্যাম্পাসের তুমুল আন্দোলন, আর তুমি ঘুমাও!

জ্বর আর মাথা ব্যথার কারণে ফারুক ওয়ারিদের সু-সত্য প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার মাথায় আসছিলো না। ক্যাম্পাসে তুমুল আন্দোলনের সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার অপরাধবোধে আনত হয়ে আমি ধীরে ধীরে জানলার কাঁচভাঙ্গা আমার ৩২৭ নম্বরের ডেরার দিকে চলতে থাকলাম। কোনো আন্দোলন হলেই কেনো ক্ষমতাসীন দলের ছেলেরা আমাদের ঘরের জানলার কাঁচ ভাঙ্গে- এই প্রশ্নের কোনো মীমাংসা না করেই আমি তালা খুলে ঘরে ঢুকলাম এবং ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বমি করে ঘর ভাসিয়ে দিলাম।

৭৭২ পর্বের দীর্ঘ উপন্যাস : ১ম কিস্তি

আমি যখন প্রিমিয়ামে জাহাঙ্গীরনগর থেকে ঢাকা আসছিলাম, তখনও আমি ঘামছিলাম। আমার সহপাঠীদের কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন- গরম তো আর কম না, গাড়ির গরম, বাতাসের গরম, সূর্যের গরম, মানুষের গরম- সব মিলে গরম এত বেশি যে এসি গাড়িতেও আমাকে ঘামতে হচ্ছে।

ঢাকা থেকে রূপগঞ্জের পথে গরমে আমি কোমল পানীয় পান করতে বাধ্য হই, যার কোনো ফুড ভ্যালু নেই। এবং খেয়াতে নদী পাড় হবার সময় আমি নদীর পানিতে হাত মুখ ধুয়ে ঠাণ্ডা হতে চেষ্টা করি। এ নদীটিকে স্থানীয় লোকেরা বালু নদী বলে।

আমি যখন বাড়ি এসে পৌঁছাই, বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে আমার বোন হাতপাখা এনে দেয়। কারণ অনেকদিন ধরে এলাকায় বিদ্যুত নেই। আমি হাতপাখা নাড়ি। কিন্তু একটু পরেই থেমে যাই। ক্লান্তিতে নয়, বাড়ির চারপাশের গাছগুলো প্রচণ্ডভাবে নড়ছে, সুতরাং বইছে বাতাস প্রবলভাবে। সূর্যের নীচে প্রচুর কালো মেঘ, আমাদের মাথার ওপর- তাই সূর্যের উত্তাপ এবং আলো দুইই উধাও।

একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হলো। প্রচণ্ড বৃষ্টি। অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি। আমার পিচ্চি বোনটা 'ভাইয়া দেখ মেঘ' বলে চীত্কার করতে থাকে। আমি মেঘ দেখি। দেখি থামার কোনো লক্ষণ নেই। আমরা বৃষ্টিকে অনন্ত ধরে কাজের পরিকল্পনা করি। তখন দুপুর সাড়ে তিনটাতেই ঘরে হ্যারিকেন-মোমবাতি জ্বলে ওঠে। আমি দুপুর সাড়ে তিনটাতেই দুপুরের খাওয়া সেরে ফেলি, বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় থাকি না।

এবং সেই দুপুর সাড়ে তিনটাকেই আমাদের কাছে সন্ধ্যা মনে হয়। সন্ধ্যাকে মনে হয় নিশুতি।

সেই সন্ধ্যা বা রাতে আমি ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে লিখতে বসি, তবু দরজা-জানলার ফাঁক দিয়ে হুড়মুড় করে বাতাসের, পানির ঝাপটা এসে টেবিল ভিজিয়ে দেয়, হ্যারিকেন নিভিয়ে দিতে চায়।

সে রাতে আমি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি, পরদিন সকালে আকাশ উজ্জ্বল হলে আবার লিখবো কিংবা দিনের বাকি কাজগুলো করবো ভেবে। কিন্তু সকালে দেখি বৃষ্টি ঝরছেই। বৃষ্টি ঝরতেই থাকে। আমি আবারও রাত হলে শুয়ে পড়ি। কিন্তু আমার কিছু লিখতে ইচ্ছে করে। এ প্রচণ্ড শীতে যখন আমি কম্বলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি, তখনও মশারির বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু আমি লিখতে চাই। সুতরাং লেখার জন্য উঠি এবং লিখি।

তখনই একদল রংবেরংয়ের পোকা আমার হাতে, কাগজে, গায়ে এসে বসে। ওরা বাইরে থাকতো, বৃষ্টি ওদের বাইরে থাকতে দেয়নি।

রাজাকারদের দোসর কারা?




বদলে দেয়ার ভণ্ডামি

প্রথম আলোর “বদলে যাও, বদলে দাও”-এর যে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনগুলো বানানো হয়েছে, সেগুলোতে প্রথম আলোর চরিত্র বেশ ভালোভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে। ধরুন ঐ বিজ্ঞাপনটার কথা যেখানে দু’জন লোক দারিদ্র দূরীকরণ নিয়ে প্রথম আলো স্টাইলে আলোচনা করতে করতে ফুটপাত ধরে হাটেন, ছোট একটি ছেলে তাদের পথে এসে হাজির হলে তারা তাকে এমনভাবে সরিয়ে দেন যে ওর খাবারগুলো রাস্তায় পড়ে যায়। ঝাক্কাস। পুরা প্রথম আলো। প্রথম আলো ওই আলোচকদ্বয়ের মতোই কেবল ‘যা কিছু ভালো’ টাইপের কিছু সস্তা কথা বলে যায়, কখনো সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে না, সমাধানের প্রশ্ন তো ওঠেই না।

ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি : বিভ্রান্তিকর শব্দবিন্যাস

আয়োজকরা হয়তো সচেতন ভাবে করছেন না, কিন্তু ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি উদযাপন আসলে প্রকারান্তরে জনমানসে ঢাকাকে কমবয়সী একটি নগর হিসেবে প্রতীয়মান করছে। প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য অনুসারে ঢাকার বয়স কমপক্ষে ১৭০০ বছর অথবা আরো বেশি।

ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি উৎসব উদযাপনের বছরে ঢাকার বয়স প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে প্রাসঙ্গিক। অবশ্য ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে সচেতন ব্যক্তিমাত্রই ঢাকার বয়স কত-এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই সমুদ্রগুপ্তের (৩৩৫-৩৮০ খ্রীস্টাব্দ) এলাহাবাদ প্রশস্তি লিপিসাক্ষ্যটি একবার স্মরণ করেন। কেননা, ঢাকা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল বিষয়ে সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত সাক্ষ্য এখনও পর্যন্ত এটিই। এই শিলালিপিটিতে বর্ণিত সমতট জনপদটির একটি নগর হিসেবে "ড্বকা"-র যে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিকেই ঢাকা সর্ম্পকে সবচেয়ে প্রাচীন উল্লেখ বলে মনে করা হয়।

কুমিল্লা অঞ্চলে প্রাপ্ত অনেকগুলো বৌদ্ধ বিহার, যার বিবরণ দিয়ে গেছেন হিউয়েন সাং (৬০৩-৬৬৪ খ্রীস্টাব্দ), তার ভিত্তিতে কুমিল্লা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলটিকেও কোনো কোনো ঐতিহাসিক সমতটের সঙ্গে কল্পনা করে থাকেন। কিন্তু সম্প্রতি উয়ারী-বটেশ্বরে আবিষ্কৃত ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রাগুলো (যার বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর) জনপদ হিসেবে সমতটের অবস্থান ঢাকার আরো নিকটবর্তী করে তুলেছে। ঐতিহাসিক তত্ত্ব হিসেবে সাধারণত মুদ্রার ওজন, আকার এবং প্রতীককে ভিত্তি করে জনপদের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এর ভিত্তিতে উয়ারী-বটেশ্বরকে একটি জনপদ এবং একটি সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে প্রমাণ করা যায় (বিস্তারিত জানতে দেখুন EASAA Handbook 2005, University of London)।

সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ লিপিসাক্ষ্যে বর্ণিত ‘ড্বকা’ নগরীকে ঢাকা নামের অপভ্রংশ মনে করা হয়। আর যদি সমতট বর্তমান ঢাকা থেকে বেশি দূরে না হয়, তবে সমুদ্রগুপ্তের "ড্বকা"কেই আমরা বর্তমান ঢাকা বলে মনে করতে পারি। উয়ারী-বটেশ্বরের গবেষণা থেকে সমতট যে ঢাকার অনেক নিকটবর্তী ছিল সেটি একরকম নিশ্চিত।

ব্যাপক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার অভাবে আপাতত আমরা এই তিনটি সম্ভাবনাকে একত্রিত করে, অর্থাৎ এলাহাবাদ লিপিতে বর্ণিত জনপদ সমতট, শহর ড্বকা এবং উয়ারীর মুদ্রা- এই তিন অনুষঙ্গকে মিলিয়ে বলতে পারি, সম্ভবত খ্রীস্টিয় ৩য়-৪র্থ শতকেই ঢাকা একটি নগর হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে অর্থাৎ পাল ও সেন যুগেও যে ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি নগর ছিল, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে। তবে, আমাদের মনে রাখা দরকার, নগর হিসেবে ঢাকাকে কেবল তার বর্তমান সীমারেখার মধ্যে কল্পনা করলে চলবে না। তখনকার যুগে নদীপথ নির্ভরতার কারণে অনেক সময় সুবিধাজনক এলাকায় নগর স্থানান্তরিত হয়েছে। এই বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, সাভার এবং ধামরাইকেও ঢাকার মধ্যেই ধরতে হবে।

সুবেদার ইসলাম খাঁ-র ঢাকায় আসার অনেক আগেই ঢাকায় স্থাপিত কমপক্ষে ১৫ টি স্থাপনা এখনও দেখা যায়। এগুলো হলো- সাভারের রাজা হরিশচন্দ্রের ভিটা বলে পরিচিত বিদ্যায়তনটি (৭ম-৯ম শতক), রামপালের বল্লাল বাড়ি (১২শ শতক), বুড়িগঙ্গার তীরে রাজা চাঁদ রায়ের প্রাসাদ এবং মঠ (১৬শ শতক), কাপাসিয়া দুর্গ (১৬শ শতক), কালী বাড়ি (১৬শ শতক), গুরুনানক স্থাপিত কূপ ও মন্দির (১৫শ শতক- বিলুপ্ত), ঢাকেশ্বরী মন্দির (মতান্তরে ১২শ-১৬শ শতক), কেল্লা মোবারকাবাদ (১৫শ শতক), বিনত বিবির মসজিদ (১৫শ শতক), পাগলা সেতু (১৬শ শতক), নাসওয়া গলির মসজিদ (১৫শ শতক), মীরপুরের মাজার ও মসজিদ (১৫শ শতক) (আরো স্থাপনার তালিকা জানতে দেখুন A Guide to Ancient Monuments of East Pakistan by Dr. S.M. Hasan, Society of Pakistan Studies, 1970 এবং বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ, আ কা মো যাকারিয়া, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ১৯৮৪)। এই পনেরটি স্থাপনার বাইরে নারায়ণগঞ্জ (সোনারগাঁও ও বন্দর) এবং মুন্সিগঞ্জের অপর স্থাপনাগুলো ধরলে এই সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে যাবে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমেও আরো অনেক স্থাপনা পাওয়া সম্ভব বলে আমরা মনে করি, কেননা এখন পর্যন্ত যেখানে খনন হয়েছে সেখান থেকেই প্রাচীনতর স্থাপনা আবিষ্কৃত হয়েছে। এইসব স্থাপনা নিঃসন্দেহে নগর হিসেবে ঢাকার প্রাচুর্য ও বিকাশের প্রতিনিধিত্ব করে।

সুবেদার ইসলাম খাঁ-র সুবের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে নির্বাচন করার দিনটি ইতিহাসের আলোকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐ দিন-তারিখটির উদ্যাপন ইতিহাসের দিকেই আমাদের চোখ ফেরাতে বলে। কিন্তু তা কোনোভাবেই সমৃদ্ধ নগরকেন্দ্র হিসেবে ঢাকার হাজার বছরের ঐতিহ্যকে বিয়োজন করে হতে পারে না।


পুনশ্চ: চারশ' বছর পূর্তি হচ্ছে সুবেদার ইসলাম খাঁ-র সুবে-র রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে ঘোষণার। যদিও ঢাকা খুব বেশি দিন সুবে-র রাজধানী থাকেনি, তবু সুবে-র রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে বেছে নেওয়ার কারণে ঢাকা নগরের গুরুত্ব বোঝা যায়। কিন্তু মূল প্রশ্নটা অন্যখানে। এই লেখা পড়ার পর হয়তো আপনারা ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই ধরে ফেলেছেন। সেটি হলো, সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্যের এক সুবে-র একটি নগরী হিসেবে ঢাকাকে নির্বাচন করায় তার যদি চারশ' বছর পূর্তি হতে পারে, তবে সম্রাট সমুদ্র গুপ্তের এক জনপদের নগরী হিসেবে ঢাকার অবস্থানের ১৭০০ বছর পূর্তি কেন হতে পারে না? ইতিহাস তো সমুদ্র গুপ্তকে জাহাঙ্গীরের চেয়ে বড়ো সম্রাট বলেই স্বীকৃতি দেয় এবং জনপদগুলোকেও সুবে-র চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে না। ১৯৯৩ সালে বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয়ের সাতশবছর উদযাপনের নামে যারা ইতিহাসবিকৃতির চেষ্টা করেছিলেন, সেই মৌলবাদী শক্তি এখনো সেই চেষ্টাই করছে কিনা, সেটাই মূল প্রশ্ন।


চারশ' বছর হোক, সাতশ বছর হোক, সতেরশ বছর হোক, ইতিহাসের দিকে আরো একটু বেশি সচেতনভাবে এবং আরো নিরপেক্ষভাবে সবাই নজর দিক সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।