রবিবার, ২ জানুয়ারী, ২০১১

ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ও বিনায়ক প্রশ্ন

স্ত্রী ইলিনা সেনকে বিয়ের আগে প্রেমপত্র (আদালতের ভাষায়, “লাভ লেটার”) লেখার অভিযোগসহ ১১ টি অভিযোগে ছত্তিশগড়ের বিশেষ আদালত ডাক্তার বিনায়ক সেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। ছত্তিশগড়ে ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীরা যা করে চলেছে, সেই তুলনায় একে সামান্যই বলা চলে। একটি ভিডিও-কে রেফারেন্স করে বিবিসি জানিয়েছে, মাওবাদীদের সাথে যোগাযোগ আছে এই অভিযোগে ভারতীয় পুলিশ গ্রামের এক নারীকে গণধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেছে। বিনায়ক সেন ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে পারেন তার অন্তত সেরকম কিছু হয়নি।

যদিও শেষাবধি মাওবাদীরা বিনায়ক সেনের প্রহসনমূলক শাস্তির প্রতিবাদে “প্রতিবাদসপ্তাহ” পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, কিন্তু শুরু থেকেই তাকে তাদের দলীয় কর্মী বলে স্বীকার করেনি দলটি। বিনায়ক নিজেও কখনো সেই দলের কর্মী ছিলেন না বলে দাবী করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিনায়ক একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং মানবাধিকারকর্মী। ভেলোর ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ ডাক্তারি পাস করে ছত্তিশগড়ের আদিবাসী শিশু ও দুঃস্থ মানুষদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন এক হাসপাতাল। মানবতার সেবার জন্য তাকে ইউনেস্কো পদক, গ্লোবাল হেলথ কাউন্সিল এওয়ার্ড সহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা দেয়া হয়। জাতিসংঘ আহ্বান জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী মানবতাবাদীরা যেন তার মডেলকে অনুসরণ করে এগিয়ে আসেন।

আসুন দেখা যাক, তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ করছে ভারত সরকার। বিনায়ক সেনের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, তিনি আটক মাওবাদী দার্শনিক নারায়ণ সান্যালের চিঠি কলকাতার ব্যবসায়ী পীযূষ গুহের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। বিনায়ক সেন জানিয়েছেন, জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নারায়ণের সাথে দেখা করেছেন বিনায়ক। চিঠি চালাচালির কথাও স্বীকার করেছেন বিনায়ক, নারায়ণ এবং পীযূষ- তিনজনেই। তারা জানিয়েছেন, যথাযথ জেল কোড মেনেই সে চিঠি নেয়া হয়েছিলো, জেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সীলমোহর-ও ছিল তাতে।

কিন্তু তাতে কী? নারায়ণের জেলে আটক থাকার প্রায় ১ বছর পর পুলিশ উদ্ধার করে ৩ টি চিঠি, যেগুলোতে জেল কর্তৃপক্ষের কোনো সীল নেই। পুলিশ বলেছে, এই চিঠিগুলো নারায়ণের লেখা এবং সেগুলো পাঠানো হয়েছিল পীযূষকে এবং তা বয়ে নিয়ে গেছেন বিনায়ক। এই ৩ টি চিঠি ও অভিযোগ ৩ টির কথা তিনজনেই অস্বীকার করেন। কিন্তু আদালত মেনেছেন পুলিশের অভিযোগই। যে আইনে বিনায়কের বিচার হচ্ছে, সেই বিশেষ আইনের ১০ (ক)-এর ১ ধারা মতে বিনায়কের সর্বোচ্চ ২ বছরের সাজা হবার কথা এই অভিযোগে। আর ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০(খ) ধারা অনুসারে, “গুরুতর” শাস্তিপ্রাপ্ত আসামীর অননুমোদিত চিঠি বহনের শাস্তি সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড।

বিনায়কের বিরুদ্ধে ২ নম্বর অভিযোগ, বিনায়ক সেন আটক মাওবাদী দার্শনিক নারায়ণ সান্যালের সাথে ৩০ দিনে ৩৩ বার দেখা করেছেন। বিনায়ক জানিয়েছেন, নারায়ণের সার্জারির ডাক্তার হিসেবে পুলিশের উপমহাপরিদর্শকের স্বাক্ষরিত অনুমতি নিয়েই তিনি তার সাথে দেখা করেছেন। সেই অনুমতিপত্রও আদালতকে দেখানো হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে ৩ নম্বর অভিযোগ, স্ত্রী ইলিনাকে প্রেমপত্র লেখা। রাজনন্দীগাঁও থেকে পুলিশ এই চিঠি উদ্ধার করেছে। পুলিশের অভিযোগ, তাদের ব্যক্তিগত চিঠি সেখানে কিভাবে গেল? বিনায়ক সেন জানিয়েছেন, বিয়ের আগে যেহেতু তারা দু’জন দুই জায়গাতে থাকতেন, কাজেই চিঠিটি অন্যত্র পাওয়া গেছে।

৪ নম্বর অভিযোগ, ফারসগড়-এর ডাস্টবিন থেকে গোন্ডি (গোদ আদিবাসীদের ভাষা) ভাষায় লেখা কিছু ময়লা কাগজের টুকরা পাওয়া গেছে। এগুলোর কোনোটিতে বিনায়কের নাম, কোনোটিতে ইলিনার নাম, কোনোটিতে রাজেন্দ্র সায়্যালের নাম লেখা। বিনায়কের আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, ডাস্টবিনের ময়লা কাগজগুলো থেকে কোনো কিছুই স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে না, সুতরাং এই বিষয়ে তারা ডিফেন্ড করা থেকে বিরত থেকেছেন।

বিনায়কের বিরুদ্ধে ৫ নম্বর অভিযোগ হলো- বিনায়ক নারায়ণের সুস্থতা কামনা করে একটি শুভেচ্ছা কার্ড পাঠিয়েছেন। বিনায়ক জানিয়েছেন, চিকিৎসক হিসেবে রোগীর সুস্থতা প্রত্যাশা করেছেন তিনি।

৬ নম্বর অভিযোগ হলো- মদনলাল বারকাদে নামে জনৈক ব্যক্তি ডাকযোগে বিনায়ককে একটি চিঠি দিয়েছেন। মদনলাল তখন বিলাসপুর জেলে আটক ছিলেন, তিনি চিঠিতে জেলখানায় তার ওপর নিপীড়নের চিত্রটি বিনায়ককে জানান। বিনায়ক জানিয়েছেন, জেল থেকে কেউ তাকে চিঠি লিখলে, সে বিষয়ে তাকে কেন দোষী করা হবে? তাছাড়া জেলখানার যথাযথ অনুমোদন নিয়েই ডাকযোগে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে এবং মানবাধিকার সংস্থা পিইউসিএল-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিনায়ক সেন এই চিঠি প্রেস কনফারেন্স করে সাংবাদিকদেরকে দেখান। সুতরাং এখানে তার পক্ষ থেকে লুকোছাপার কোনো ব্যাপার ছিল না।

৭ নম্বর অভিযোগ- স্বামী তুষার কান্তি ভট্টাচার্যকে লেখা স্ত্রী সোমা সেনের চিঠি। তুষার কান্তি তখন নকশাল আন্দোলনে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামী। বিনায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নকশালদের সহযোগিতা করেছেন। বিনায়ক জানিয়েছেন, খেলরন্জি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য তার সংগঠন কাজ করেছে এবং তারা এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছেন।

বিনায়কের বিরুদ্ধে ৮ নং অভিযোগ, বিনায়ক সেন একটি কম্পিউটার ব্যবহার করেন। হাস্যকর ঠেকলেও এটাই সত্যি এবং এই ধরনের অভিযোগেই তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা তার কম্পিউটারটি জব্দ করে নিয়ে যায় এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানায়, এর মাধ্যমে কিংবা এর মধ্যে বেআইনী কাজের কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু ভারতীয় পুলিশ কম্পিউটারটিকেও একটি অপরাধ হিসেবে আদালতে অভিযোগ দায়ের করে।

৯ নম্বর অভিযোগ হচ্ছে, সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদপত্রের সংবাদ বিনায়ক পত্রিকা কেটে সংরক্ষণ করেন এবং টিভির সংবাদ রেকর্ড করে সিডিতে রাখেন। বিনায়ক জানিয়েছেন, মানবাধিকার সংগঠনের এটি একটি নিত্যকার কাজ।

বিনায়কের বিরুদ্ধে ১০ নম্বর অভিযোগ পিএইচডি গবেষক অমৃতা শ্রীবাস্তব ছত্তিশগড়ে একটি ব্যাংক খোলার সময় বিনায়ক তার ইন্ট্রোডিউসার (পরিচয় দানকারী) ছিলেন। ছত্তিশগড় কিংবা ভারতের কোনো ব্যাংক থেকেই এই ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য অমৃতা শ্রীবাস্তব ২০০৫ থেকে নিখোঁজ। পুলিশের অভিযোগ সে নকশালপন্থী, বর্তমানে সে আত্মগোপনে আছে, তবে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।

বিনায়কের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগ, অমৃতা শ্রীবাস্তবের বাসা খুঁজে দেয়ার জন্য বিনায়ক সহযোগিতা করেন এবং তাকে সেই বাড়িতে ওঠান যেখানে আগে নারায়ণ সান্যাল থাকতেন। বিনায়ক এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অমৃতা যে বাড়িতে থাকতেন ছত্তিশগড় পুলিশ দাবি করেছে, তারা সেই বাড়ি থেকেই নারায়ণ সান্যালকে গ্রেফতার করেছে; অন্যদিকে অন্ধ্র পুলিশ দাবি করেছে, তারা ভদ্রচলম থেকে নারায়ণ সান্যালকে গ্রেফতার করে ছত্তিশগড়ের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।


এ-ই। সর্বমোট ১১ টি অভিযোগ। এবং অভিযোগগুলোর প্রতিটিই প্রমাণ করা গেছে বলে আদালত মন্তব্য করেছে। সুতরাং অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

কী বলবেন?

কফিল আহমদ : নিঃসঙ্গ প্রমিথিউস

টিএসসি সড়ক দ্বীপে সমগীতের ১ম কেন্দ্রীয় সম্মেলনে কফিল আহমেদের গান শুনলাম আজ (শনিবার)। সেটিকে প্রেক্ষিত করেই দু’চারটি কথা লিখবো ভেবেছিলাম। কিন্তু লেখাটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমনিতেই লোকে আমার লেখা পড়ে না (আগের লেখাটি পঠিত হয়েছে সাকুল্যে ৭ বার)। দীর্ঘ লেখা দিলে আরো পড়বে না। সেই ভয়ে কেটেছেটে এবং কেটে কেটে দিলাম।

●●●

কল্পনা করুন শৃঙ্খলিত প্রমিথিউস নাটকের সেই দৃশ্যটি যখন ওশেনাসের কন্যারা এলো নিঃসঙ্গ প্রমিথিউসের করুণ পরিণতি দেখতে। তারা জানতে চাইলো- সময়ের দেবতা হয়ে, যখন অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই আপনার নখদর্পণে, তখন আপনি এই নিষ্ঠুর পরিণতি কেন এড়িয়ে গেলেন না? প্রমিথিউসের জবাবটিও প্রণিধানযোগ্য- “জানা আর না জানা, সমান আমার কাছে”। কেননা, অসহায় এবং মরণশীল মানুষের অন্তরে আগুন জ্বেলে দিতে তিনি কখনো পিছপা নন।

●●●

ঘোড়াউত্রা নদীতীরের কবি স্বভাবের লাজুক ছেলে কফিল আহমেদ। হাওড়ের ভাটিয়ালি আর ভাসান গানের মুগ্ধ রাতজাগা শ্রোতা। জেলা শিক্ষা অফিসারের ছেলে হিসেবে কফিল আহমেদের ভাইয়েরা প্রত্যেকেই মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষিত। ছোট ছেলে কফিল যখন ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তখন অপর ভাইদের একজন আমেরিকা, একজন ইংল্যান্ড এবং একজন ফ্রান্সে বসবাস করছেন। বাবামায়ের আশা- মেধাবী ছাত্র কফিল-ও কোনো একটি স্কলারশীপ নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বড়ো কোনো ডিগ্রি নিয়ে বাড়ি ফিরবে। সে আয়োজনও সম্পন্ন হলো। ফরাসী দেশের শিল্প ও শিক্ষার আকর্ষণে প্যারিসের টিকেট হাতে নিয়ে বিমানবন্দর পর্যন্তই যেতে পারলেন। তারপর আর নয়। দেশ ছাড়তে পারলেন না। বাবামা কঠোর হলেন, “ঠিক আছে- এই দেশে থাকতে হলে একটি শর্তেই থাকতে পারবে। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে হবে”। তখন দেশে সেনাশাসন চলছে। সেনাদের জয়জয়কার চারিদিকে। কফিল আহমেদ সেনাবাহিনীতে ভর্তি হলেন। কিন্তু পালালেন সেখান থেকেও। এমন ‘ভাড়াটে সৈনিকে’র জীবন তার নয়। বাবামা অবশেষে শর্ত দিলেন- যেহেতু জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আছেন, জাহাঙ্গীরনগরের ইংরেজি বিভাগটি ভালো, সেখানে ভর্তি হতে হবে এবং পাস করে বিসিএস দিয়ে পররাষ্ট্র বিভাগে চাকরি নিতে হবে। শান্ত সুবোধ ছেলের মতো মায়ের বাধ্যগত লাজুক ছেলেটি এইবার যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ভর্তি হলেন, ইংরেজি বিভাগে। পাস করে বিসিএস দিয়ে ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ চাকরিও পেয়ে গেলেন। কিন্তু হাওড়ে তখন শুরু হয়েছে- ভাসানপানির আন্দোলন এবং “জাল যার জলা তার” শ্লোগানে জলমহালের ইজারাবিরোধী লড়াই। যে জেলেদের সাথে আশৈশব আকণ্ঠ আবদ্ধ ছিলেন ভাটিয়ালি-ভাসান গানের সুরের বাঁধনে, তাদের লড়াইয়ের শ্লোগানেও কণ্ঠ মেলালেন তিনি। অন্য এক কফিল আহমেদের সৃষ্টি তখনি। আসন্ন আয়েসী জীবনের হাতছানি ফেলে অসহায়-মরণশীল জেলেদের অন্তরে আগুন জ্বেলে দিতে এলেন কফিল আহমেদ।

লড়াই সশস্ত্র হলো। ইজারাদারদের ভাড়াটে “লোকাল” এবং তাদের প্রহরী বহিরাগত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে অগ্নিস্নাত জেলেদেরও হয়ে পড়তে হয় হত্যাপ্রবণ। কফিল বলেন, “আগুন তুমি ভাড়াটে লোকালের ভোট চাওয়া নও, হত্যাপ্রবণ”। যে আগুনের পরিণতি ছিলো সিগারেটের ছাইভস্মে তা এসে আশ্রয় নিলো “গেরিলার বুকে লুকিয়ে থাকা গ্রেনেডে”।

●●●

গত ২৫ বছর ধরে অবিরাম আপোসহীন লড়াইয়ে বাংলা গানের ধারায় তিনি যুক্ত করেছেন এক নতুন মাত্রা। প্রচলিত “গণসঙ্গীত” কিংবা “আধুনিক গান”-এর “প্রকরণ” থেকে কফিল আহমেদ অনেক দূরবর্তী। বস্তুত জীবন ও শিল্পের সকল প্রকরণই কফিলের কাছে “সোনার রাজার মতোই কুৎসিত”। কেননা কফিল “সাতটা শঙ্খ একবারে” বাজাতে চান। কফিল আহমেদের গান তাই না গণসঙ্গীত, না আধুনিক, না লোকগীতি। কফিলের গান আসলে অগ্নিসঙ্গীত। দাহিকা বলাই সবচেয়ে ভালো হয়। কফিল আহমেদের গান হৃদয়ে দহনের সৃষ্টি করে। সে দহন রাজনীতি হোক কিংবা প্রেম! কফিল মানুষ এবং মানুষের জীবনের জটিলতায় অগ্নি প্রজ্বলন করেন। কাজে কাজেই ভদ্রলোকীয় তাল ঠুকতে ঠুকতে কফিলের গান শোনা অসম্ভব, ধারণ করা দুঃসাধ্য। কাজেই মসৃণ মানসে কিংবা মাধ্যমের ত্বকে কফিলের “বালিঘষা”(১) কণ্ঠ সহ্য করা সম্ভব হয়নি।

পাহাড় পোড়ানোর আকাঙ্খায় জনমানসে আগুন প্রজ্বলনের কাজে কফিল আহমেদ শুরু থেকেই নিঃসঙ্গ। এই ধারার সূচনা গৌতম ঘোষদের “মহীনের ঘোড়াগুলি” থেকেই সূচিত হয় বলা চলে। অনুসরণ করেছেন সুমন, নচিকেতারাও। তবে কফিল তাদের থেকে স্পষ্টভাবেই ভিন্ন। ‘সমাজতান্ত্রিক’ পশ্চিমবঙ্গে (ও কলকাতায়) যে নাগরিক চেতনা বিকশিত হয়েছে, বাংলাদেশে তা হয়নি একেবারেই। ২০১১ সালেও এই দেশে জলাধারের অধিকারের জন্য হাওড়ের জেলেদের লড়াই চলছেই। শহুরে নাগরিক এবং গ্রাম বা মফস্বলের শ্রমিক-কৃষক-জেলে এই উভয় জনমানসের আকাঙ্ক্ষার সুর একমাত্র কফিলই ধারণ করেছেন। বরং শহরের শিক্ষিত জনসমাজের চেয়ে কফিলের গান বেশি জনপ্রিয় হাওড়ের জেলে ও কৃষকদের কাছে। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যখন জানা যায়, তার প্রথম অ্যালবামের অর্ধেকেরও বেশি ক্যাসেট বিক্রি হয়েছে হাওড় অঞ্চলে কৃষকজেলেদের কাছে। সেই দিক বিবেচনায় সুমন, নচিকেতারা একেবারেই খণ্ডিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি।

সমকালের বাংলাদেশে এই ধারায় গান গেয়ে মাহমুদুজ্জামান বাবু, অর্ণব, অরূপ রাহী, কৃষ্ণকলি প্রমুখ কিছুটা খ্যাতিও পেয়েছেন। শুরুর দিকে এদের কারো কারো মধ্যে দাহিকাও দেখা গেছে। কেউ কেউ সমৃদ্ধ করেছেন এই ধরনের গানের ধারাকেও। বিশেষ করে বাবুর “হরেক রকম দিন কাটিলো” এবং রাহীর “কাকে তুমি প্রেম বলো, বলো ইতিহাস” তেমনই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আধুনিক গানের মসৃণ মাধ্যমে এদের অনেকেই মিশে গেছেন অবলীলায়। হারিয়ে গেছে গানের সেই দাহিকাও।

কিন্তু কফিল প্রজ্বলিত থেকেছেন। এবং নিঃসঙ্গও। শুধু তাই নয়, এই নিঃসঙ্গ যাত্রা থেকে কফিলকেও বিরত করে তাকে নিয়ে যেতে চান অনেকেই। এমনকি যিশুও। “যিশু আমার চন্দ্র হাতে পাতালপুরে যায়/ সে আমায় নিয়ে যেতে চায়”। কিন্তু কফিল তো যাওয়ার পাত্র নন। তার সাফ জবাব, “আমার চোখের সামনে পুড়ছে যখন মনসুন্দর গ্রাম/ আমি যাই নাই রে, আমি যেতে পারি না, আমি যাই না”।

এবং তারপর কফিল আহমেদ তার চোখের সামনের পোড়োগ্রামের সেই আগুনের “রূপকথাটা ছড়িয়ে” দিয়েছেন সবার “চোখের সামনে”। কিন্তু কেউ তা দেখে, কেউ দেখে না। যেমন প্রমিথিউসের করুণ পরিণতি দেখে হেফাস্টাসের মনে হয়, “সবকিছুই চোখের সামনে ছড়িয়ে রয়েছে, তবু কিছুই দেখতে পাই না”।

(চলবে)

শনিবার, ১ জানুয়ারী, ২০১১

সুপ্রভাত ২০১১

খ্রিস্ট্রীয় নববর্ষ একবারই ঘটা করে পালন করেছিলাম, সেটা ২০০০ সালের প্রথম দিন। তখন সবে প্রেমে পড়েছি, কাজেই প্রেম উদযাপনেরও এক উপলক্ষ পাওয়া গিয়েছিলো। নববর্ষ টববর্ষ কিছু না, দু'জনে সারারাত একসঙ্গে থাকা- সেটিই ছিল মূল ব্যাপার। এরপর নববর্ষের খোঁজখবর আর রাখিনি। কিন্তু এবার রেখেছি। কারণ মরার ২০১০ সালটি কবে চোখের সামনে থেকে বিদেয় হবে, সেই অপেক্ষায় ছিলাম। বছরটি একেবারেই ভালো কাটেনি। বলা উচিৎ- এটি ছিল আমার জন্য দুর্ঘটনার বছর। বছরের শুরুর দিন থেকে শেষ দিন অবধি অ্যাকসিডেন্ট আর অ্যাকসিডেন্ট। অন্তত দু'বার বড়ো ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা আর তিনচারবার ছোটোখাটো, সেই সাথে ডিসেম্বরের ২৫ থেকে ৩১-এর মধ্যে ২ বার দুটি নাটকীয় দুর্ঘটনায় মনে হচ্ছে, বছরটিও আমার সাথে তার শত্রুতার ব্যাপারটি যাবার বেলাতেও ভুলতে পারেনি।

বছরের শুরুর দিন যদিও পহেলা জানুয়ারি, কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবেই ৩১ ডিসেম্বর রাতটিই প্রধান উপজীব্য। কাজেই ৩১ তারিখ সকাল সকাল ঢাকায় পৌঁছুতে না পারলে সবকিছুই মাটি হয়ে যাবে ভেবে ৩০ তারিখ রাতেই ঠাকুরগাঁও থেকে বাসে উঠে বসলাম। হানিফ আমার পছন্দের তালিকায় একেবারে শেষের দিকে থাকলেও টিকেট জুটলো ওই হানিফেরই। এমনিই শীতের রাত, তার ওপর কুয়াশাও ছিল প্রচণ্ড। টাঙ্গাইলের কাছে এসে সামনের এক মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে দিল আমাদের গাড়ি। আমাদের গাড়িরও কিছু ক্ষতি হলো, আমি বসেছিলাম বি-১ নম্বর সীটে, কাজেই ধাক্কার কিছুটা জের আমার দেহে এসেও লাগলো। তবু ভাগ্য ভালো বলতেই হবে, কেননা আমি বাসেই ছিলাম, মাইক্রোবাসে না। দুর্ঘটনা ঘটলো এবং এরপর সেই শীতের কুয়াশাস্তীর্ণ রাতে ২/৩ ঘণ্টা রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে নতুন একটি গাড়ি আসার অপেক্ষা। কাজেই ঢাকা পৌঁছে নড়াচড়া করার মতো অবস্থাও আর আমার থাকলো না, থার্টি ফার্স্ট তো দূরের কথা।

কিন্তু এই দুর্ঘটনাটিকে আমি রেখেছি "ছোটোখাটো দুর্ঘটনাসমূহ"-এর তালিকায়। বড়ো দুর্ঘটনা বলতে বোঝাতে চাই যেদিন খুলনা থেকে মধ্য রাতে বৃষ্টির মধ্যে মাওয়া হয়ে ঢাকা আসছিলাম এবং পদ্মা পেরুনোর জন্য পুলিশ ইত্যাদিদের ঘুষ দিয়ে একটি স্পীড বোটে করে নদী পেরুলাম এবং যখন সেই স্পীড বোট মাঝনদীতে এসে নদীতে পোতা কোনো খুঁটির সাথে ধাক্কা লাগিয়ে প্রায় উল্টে যায় যায়...। এই দুর্ঘটনায়ও আমার কোনো ক্ষতি হয়নি, কিন্তু এই দুর্ঘটনা আমাকে দুর্ঘটনার ভয় বিষয়ে এক গভীর ধারণা দিয়েছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছি, জীবনেও আর স্পীড বোটে পদ্মা পাড় হবো না।

তবে সত্যিকারের শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন আমি হই দুটি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায়। এর একটি ঢাকা এবং একটি সাতক্ষীরায়। এই দুই দুর্ঘটনায় আমার হাত/পা-এ কিঞ্চিৎ রক্তপাত ঘটে, তবে হাড়গোড় ভাঙ্গেনি এটা বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি। এমনকি আমি মোটরারোহী না হয়েও বাসার সামনের রাস্তা পেরুতে গিয়ে মোটরের সামনে গিয়ে পড়বো, সেটিকে আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বিশেষ করে আমার সাথে তখন ল্যাপটপ, ক্যামেরা সহ নানা ধরনের সেনসিটিভ জিনিসপত্র ছিল। এবং মেনে নিতে পারছি না অফিসের কাচের দেয়াল কিভাবে আমি কার্টুন ছবির মতো ভেদ করে বেরিয়ে গেলাম! মানলাম, আমি খুব দ্রুত বেগে যাচ্ছিলাম এবং আমার দৃষ্টিও সামনের দিকে ছিল না, নিচে তাকিয়ে হাটছিলাম আমি। কিন্তু তাই বলে কাচ ভেদ করে কেন বেরুবো? কাচে ধাক্কা খাবো, মাথায় টাথায় ব্যথাট্যথা পাবো, কাচ ফেটেও যেতে পারে। টম এন্ড জেরির কার্টুন ছাড়া কাউকে কাচের দেয়াল ভেদ করে বের হবার কথা কেউ কি কোনোদিন শুনেছে? এই ঘটনাটিতেই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আমি। আমার সারা শরীরের প্রতিটি জায়গা অর্থাৎ হাত পা গলা পেট ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় কাচেরা জায়গা করে নিয়েছিলো, আমার খুবই পছন্দের শার্ট এবং প্যান্ট কেটেকুটে চিরতরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

এবং ৩১ ডিসেম্বরের ঘটনাটি তো আরো হাস্যকর। বাইজিদ ম্যাচ কোম্পানী-কুষ্টিয়ার "টু স্টার" নামে একটা দেয়াশলাই আছে, যেটি কার্বরাইজড করা হয়নি বলে আমার ধারণা, অথচ বেশি লাভের আশায় দোকানদাররা আজকাল সেটিই বেশি বিক্রি করে। সিগারেট ধরানোর জন্য যেই না আমি দেয়াশলাই বক্সে ঠুকেছি, ফট করে জ্বলন্ত বারুদ ছুটে আমার বাম চোখের ভেতর ঢুকে গেলো এবং বলা বাহুল্য, সেখানে চোখের আয়তনের অনুপাতে বড়োসড়ো এক গর্তের সৃষ্টি হলো- একেবারে ফায়ারহোল যাকে বলে। ২০১০ সালটি যদি আমার সাথে শত্রুতাই না করবে, তবে কেন এই হাস্যকর কিন্তু জঘন্য একটি দুর্ঘটনাটি দিয়ে আমাকে বছর শেষ করতে হবে?

বৃহষ্পতিবার, ৬ মে, ২০১০

একবার তুমি সাহসে হাতের লাঠি তুলে ধরলেই, দেখবে আধাঁর কাটাবার বড়ো বেশি আর দেরি নেই

একটা ঘরের ভেতরে আমাকেসহ ৫/৬ জনকে আটকে রাখা হলো। বাইরে থেকে তালাবন্ধ। ভেতরে কোনো আলো নেই। দুপুরে কি খেয়েছিলাম, মনে নেই। এরপর ৩/৪ টা গোল্ডলীফ/নেভী/কেটুর ভাগ পেয়েছি। নিজের টাকায় সিগারেট কেনার মতো টাকাও তেমন ছিল না। রাতে খাওয়া হয়নি। যে ঘরে বন্দী আছি, সেখানে খাবার মতো পানিও নেই। বাথরুম? অকল্পনীয়! তবে বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে হবে না, সেটা জানি। ভোরের সূর্য ওঠার আগে যেভাবে দেয়াল বেয়ে এখানে এসেছি, সেভাবেই দেয়াল বেয়ে এই বন্দীশালার বাইরে চলে যেতে হবে। যেতে হবে মিছিলে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী প্রথম আন্দোলনের (১৯৯৮) সময়ের কথা বলছি। প্রতি রাতেই আন্দোলনকারী ছেলেদেরকে ছাত্রলীগের ধর্ষক গ্রুপ মারধোর করছে, এ কারণে নিজের হলে নিজের ঘরে যাওয়া আমাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব। বাপী ভাই এম এইচ হলের কয়েকটি ঘরের চাবি জোগাড় করে রেখেছিলেন, মূলত সেইসব ছেলেদের যারা আন্দোলনে সহিংসতার ভয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে গিয়েছিলো। হলে প্রবেশমুখে ছাত্রলীগের প্রহরা, তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে আমাদের নিজেদের ঘরগুলোতে এসে তল্লাশী চালিয়ে যায় তারা। ভাঙচুর-ও করেছে অনেক ঘর। আর তাই নিজের হলে নিজের ঘরে না গিয়ে এবং সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে, দেয়াল বেয়ে সেইসব নিরীহ ছাত্রদের ঘরে এসেছি আমরা। বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে রাখা হয় এবং ভেতরে আলো জ্বালানো হয় না। ছাত্রলীগ বাহিনী যাতে বুঝতে না পারে ভেতরে কয়েকজন আন্দোলনকারী অবস্থান করছে। দিনের আলো ফোটার আগে আবার এই পথেই ফিরে যেতে হবে। অবস্থানের সময় বলতে রাত ১২টা/১টা থেকে ভোর ৫টা/৬টা পর্যন্ত। ভোর থেকেই আবার মিছিল, আবার স্লোগান, আবার প্রশাসনিক ভবনের (রেজিস্ট্রার বিল্ডিং) সামনে অবস্থান। সকাল ৯ টার দিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আসেন, সিন্ডিকেট বসে, তদন্ত কমিটি বসে, বিচারশালিস নানা কিচ্ছাকাহিনী। এভাবে দীর্ঘ ২ মাস ধরে চলার পর, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রায়- অধিকাংশ অপরাধী খালাস, তদন্ত কমিটির সামনে সদাচারণের জন্য শাস্তি মওকুফ, বাকিদের ১/২ বছরের বহিষ্কারাদেশ ইত্যাদি। ধর্ষকদের পক্ষে আলাউদ্দীন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উৎসাহ তাদেরকে বেপরোয়া করে দেয়, ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে তারা ক্যাম্পাসে নারকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অবশেষে ২ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয় আইন নিজের হাতে তুলে নিতে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মিছিল করে প্রতিটি হলে গিয়ে ধর্ষকদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে। বরাবরের মতো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবারো ধর্ষকদের পক্ষ নেয়। তাদের এই পক্ষাবলম্বন এমন চরম মাত্রায় পৌঁছায় যে, ২০০০ সালে আন্দোলনের সময় তারা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।

বরাবর ধর্ষক নিপীড়কের পক্ষেই প্রশাসনের অবস্থান থাকা সত্ত্বেও মানিক-তানভীর-মোস্তফারা টিকতে পারেনি। তার প্রধান কারণ জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের অদম্য সাহস এবং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ। এতোসব সত্ত্বেও কাফী এবং সানীর মতো দুই লম্পট ক্যাম্পাসে ক্ষমতাচর্চার মধ্য দিয়েই বেঁচে গেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই দুইজনের অসীম চামচামির গুণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষক সবসময় তাদের সমর্থন দিয়ে গেছেন। সেই সাথে রাজাকার-সান্নিধ্য তাদের টিকে থাকাটাকে আরো শক্তিশালী করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সামনে এই দুই শিক্ষক যেভাবে জুতোপেটার স্বীকার হয়েছেন, তার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতেই লজ্জা পাওয়ার কথা। কিন্তু মেরুদণ্ডহীন এবং দীর্ঘ জিহ্বার অধিকারী এই দুই শিক্ষক ক্ষমতাধরদের পদলেহন করে টিকে আছেন আজো। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগটি কিন্তু গোপন নয়, নিপীড়িতরা সবার সামনে এসে অভিযোগ করেছেন, বিচার চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের তদন্তের ফাইল হারিয়ে যায়, সাক্ষ্যপ্রমাণের কাগজপত্র গায়েব হয়ে যায়। নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলে থাকে। আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে ধর্ষক-নিপীড়কের পক্ষাবলম্বনের জন্য যতো ধরনের কৌশল করা যায়, তার সবই করে যাচ্ছে।

আমরা এই ঘটনায় আর কালক্ষেপন করতে আগ্রহী নই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা এবং তাদের সাথে একাত্ম অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজ জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার পাশাপাশি এই বিষয়ে নিজের নিজের অবস্থান থেকে এবং সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত ২৬ এপ্রিল মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত এক সম্মিলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজের বলয়ে এই বিষয়ে যথাসম্ভব কাজ করবেন। লেখকরা লিখবেন, সাংবাদিক প্রতিবেদন করবেন, অ্যাক্টিভিস্ট আন্দোলন চালিয়ে যাবেন, সংগঠকরা সংগঠিত করবেন, পেশাজীবীরা নিজ নিজ পেশার পরিমণ্ডলে প্রচারণা চালাবেন, আইনজীবীরা আইনী লড়াই করবেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

কাফীর বিরুদ্ধে যৌননিপীড়নের অভিযোগের ১২ বছর হতে চললো। আফসার আহমেদ এক যুগ ধরে খোঁজাখুঁজি করেও হারিয়ে যাওয়া ফাইলের হদিশ করতে পারলেন না। সানীর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে ৩ বছরের-ও বেশি সময় ধরে। প্রশাসন চলছে ঢিমেতেতালা মেজাজে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই এবার নাড়া দেওয়ার সময় এসে গেছে। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই কাজটি হতে পারে।

আমাদের প্রাণে প্রাণ মেলানো এবং প্রাণের বন্ধনীতে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আগামী ৩০ এপ্রিল ২০১০ শুক্রবার সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই বন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিটি মানুষকে আহ্বান জানাই, এই সংহতিতে অংশ নিন। (ভুলে যাওয়া) পুরনো মুখগুলোকে আবার দেখে নেয়ার, নিজেকে শানিয়ে নিয়ে নিপীড়নহীন স্বপ্ন পূরণের চেষ্টাকে আরো জোরালো করার এই বন্ধনীতে সবাইকে স্বাগত জানাই।

সোমবার, ১৬ নভেম্বর, ২০০৯

একটি জনজাদুঘরের সন্ধানে

গণচাঁদার মাধ্যমে বালিয়া মসজিদ সংরক্ষণ কাজে সাফল্যের পর (অন্য স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি) এবারে আমরা হাতে নিয়েছি জনজাদুঘর স্থাপনের একটি কাজ। জনজাদুঘর প্রত্যয়টি (পিপলস মিউজিয়াম বা কম্যুনিটি মিউজিয়াম) গত এক-দেড় দশক ধরেই জাদুঘরবিদ্যায় জনপ্রিয় একটি ধারণা হয়ে উঠছে। মানুষের (জনগণ) যা কিছু আছে সেগুলোকে মানুষ যেভাবে “উপস্থাপিত” দেখতে চায়, সেভাবে হাজির করাটাই এই ধরনের জাদুঘরের মূল লক্ষ্য। প্যালেস্টাইনের এই জনজাদুঘরটি একটু দেখুন, এই ধরনের জাদুঘর সম্পর্কে খানিকটা ধারণা পেতে পারেন।

প্যালেস্টাইনের জনজাদুঘর
প্যালেস্টাইনের জনজাদুঘর ১
প্যালেস্টাইনের জনজাদুঘর ২

দাতাসংস্থাগুলোর টাকায় বাংলাদেশে এনজিও-দের করা জনজাদুঘর বা গণজাদুঘর নামে বেশ কিছু জাদুঘর আছে। এমন কয়েকটি জাদুঘরের খোঁজ পেয়ে আমি সেগুলো দেখতে গিয়েছিলাম, প্রথম প্রথম যে অভিজ্ঞতাটি হতো তা হলো- জাদুঘর জিনিসটা যে উন্মুক্ত একটা ব্যাপার এই ধারণাও প্রতিষ্ঠাতাদের ছিল না। প্রায়শই আমাকে শুনতে হতো- এখন জাদুঘর খোলা যাবে না, অফিস থেকে অর্ডার দিলেই কেবল খোলা হবে। কবে সাধারণত খোলা হয় জাদুঘর? যখন বিদেশ থেকে কেউ আসেন।

এরপর থেকে যে এনজিও-র জাদুঘর দেখতে যাই, তাদের একজন কর্তাকে সাথে নিয়ে যাই। সে অভিজ্ঞতাও হতাশাব্যঞ্জক। প্রথমত, সংগৃহীত/উপস্থাপিত নিদর্শনের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ (কমন) হলো- ধান ও ধানচাষ সংশ্লিষ্ট কিছু জিনিসপত্র। এরপর থাকে যেগুলো তা হলো, কিছু গেরস্থালী জিনিস যা বিলুপ্তির পথে, শিলপাটা, ঢেঁকি, কাসার বাসনকোসন ইত্যাদি টাইপের জিনিসগুলো। তারপর এনজিও-টির কিছু প্রকাশনা- পোস্টার, লিফলেট, বইপত্র ইত্যাদি। আর কিছু যে থাকে না, তা না (দুএকটা ব্যতিক্রমী জাদুঘর আমাকে অবাক করে দিয়ে অফিস খোলা দিনগুলোতে খোলাই ছিল)। তবে মোটের ওপর এই ধরনেরই।

জনজাদুঘর করার জন্য জনগণের যে অংশগ্রহণ প্রয়োজন সেটি ওই জাদুঘরগুলোর বেশিরভাগের ক্ষেত্রে একেবারেই ছিল না। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো- জনজাদুঘর মানেই যে একটা উৎসব উৎসব ভাব, একটা প্রাণে প্রাণ মেলানোর ব্যাপার থাকে এইসব জাদুঘরে সেটি পুরোপুরি অনুপস্থিত।

একটি জনজাদুঘরের পরিকল্পনা আমরা করছিলাম গত ৪/৫ বছর ধরেই। সত্যিই আমরা জানি না, যেমন একটি জাদুঘরের স্বপ্ন আমরা দেখছি, তেমনটি করতে পারবো কিনা; তবে আমাদের দলের ছেলেমেয়েদের স্পৃহা অসীম। এই স্পৃহাই আমাদের নিরন্তর প্রেরণা জোগাচ্ছে একটি প্রাণবন্ত জাদুঘর প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে। খুঁটিনাটি পরিকল্পনা সব সেরে ফেলেছি, এমন নয়। তবে তো আর কোনো কথাই থাকতো না। ধান, পাট থাকবে আমাদের জাদুঘরে- হয়তো; তবে প্রাণের ঐকতানটাকেই আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি।

এই জাদুঘরটি আমরা জনসচেতনতার জন্য করতে চাই না; বিশ্বশান্তি- নিদেনপক্ষে ওই এলাকাটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও না; দেখো আমাদের কী সম্পদ আছে, এই অহমিকা তৈরির জন্যেও না। আমরা এটি করতে চাই, মানুষের শক্তি ও দুর্বলতা, মানুষের অর্জন ও অপরাধ, পরিবেশ ও ইতিহাসের সাথে মানুষের অভিযোজনশীলতা, মানুষের প্রকাশের আনন্দ ও অপ্রকাশের বেদনা- মোট কথা মানুষের অনুভূতিকেই অনুভব করার একটা জায়গা তৈরি করতে চাই। প্যালেস্টাইনের জনজাদুঘরটিতে এক বৃদ্ধ নারী তার উদ্বাস্তু জীবনের গল্প শোনাচ্ছিলেন অন্যদেরকে। প্যালেস্টাইনের মানুষের কাছে উদ্বাস্তু জীবনের গল্প? মা-র কাছে মামাবাড়ির গল্পের মতোই ব্যাপার! তবু কিশোরকিশোরীরা তো বটেই, ওই উদ্বাস্তু নারীর অনেক সহযাত্রীও বার বার তার গল্প শুনে আপ্লুত হয়েছেন, আয়নাতে যেন নিজেকেই বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিচ্ছিলেন। (মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে “মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনো” প্রকল্পটি তাই এতো জনপ্রিয় হয়েছিল)

জাদুঘরের কাজ আসলে খুব কঠিন। বিশেষ করে টাকাপয়সার কথা ভেবে ব্যাপারটা আমাদের কাছে এক সময় খুব অসম্ভব বলেই মনে হয়েছিলো। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপার আমাদেরকে বার বার আমাদের স্বপ্নের কাছে ফিরিয়ে আনে। টিমমেটদের স্পৃহা-টা তো আছেই, বাইরের কিছু প্রভাব-ও আছে। শিল্পকলা একডেমীর কনজারভেশন ল্যাবরেটরিতে যখন কাজ করতাম, অফিস সহকারী মীজান ভাই করতেন আমাদের দশগুণ কাজ। অফিসে বসে ফাইলপত্র নাড়াচাড়া করলেই তার চলতো, কিন্তু কিছু লোক আছেন যারা আরেকটু বেশি কিছু করেন, তিনি তেমন-ই একজন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও, অনেক কাজেই তিনি এখনও আমাদের একমাত্র ভরসাস্থল। জনজাদুঘরের জন্য নগর থেকে কিছুটা দূরে কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটামুটি ভালো এমন একটা জায়গা খুঁজছিলাম আমরা। মীজানুর রহমান আমাদের সেই সমাধান দিয়েছেন, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় পূর্ণিমাগাতীতে পাঁকা রাস্তার ধারে তার ৮ শতাংশ জমি এই জাদুঘরের জন্য দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাই আমাদের জানিয়েছেন, আমরা যদি সত্যিই জাদুঘরের কাজ শুরু করি, তাহলে তিনি তার অংশের ৮ শতাংশ জমিও দান করবেন।

মীজান ভাইয়ের জমি আর আমাদের স্বেচ্ছাশ্রমের সঙ্গে এবার আপনার একটু সাহায্য চাই; এখনও জাদুঘরের নামে কোনো একাউন্ট আমরা খুলিনি, সুতরাং টাকাপয়সা চাচ্ছি না (ভবিষ্যতে লাগলে জানাবো); যা চাচ্ছি তা হলো পরামর্শ। অনেকেই আছেন যারা দেশবিদেশের অনেক জাদুঘরেই গেছেন এবং/অথবা জানাশোনা/পড়াশোনাও অনেকের অনেক ভালো। সুতরাং আপনার মতামত খুবই কার্যকরী হতে পারে এই জনজাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে।

আর একটা অনুরোধ-ও এর পাশাপাশি করি। তা হলো- আপনাদের কারো কাছে যদি “পুরনো দিনের আবর্জনা” ধরনের জিনিস কিছু থাকে, বাপদাদার আমলের লোটাবদনা, ঘড়ি-ছড়ি, পুরনো বইপত্র, যা-ই হোক, যা ভাগাড়ে ফেলে রেখেছেন, ঝেটিয়ে বিদেয় করতে চান তাড়াতাড়ি, আমাদের খবর দিন। আমরা আপনার কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করবো।

রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০০৯

বালিয়া মসজিদ সংরক্ষণ : গুইসাপ

Align Left

এই ছবিগুলো আজ (২ নভেম্বর ২০০৯) দুপুরে তোলা, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া মসজিদের সংরক্ষণ কাজ করতে করতে আমরা যেসব প্রাণীকুলের দেখা পেয়েছি, তার মধ্যে উনাদের জ্ঞাতি-স্বজনরাও ছিলেন। আমরা উনাদেরকে নিকটস্থ কবরস্থানে পুনর্বাসনের জন্য চেষ্টা করেছি। এই পুনর্বাসন প্রকল্পের (!) বিরোধিতাকারী কিছু দখলবাজ পুঁজিবাদী অথবা সকল সম্পত্তিতেই সকলের অধিকার আছে এমন কম্যুনিস্ট অথবা তোমাদের সম্পত্তিতে আছে অসহায়দের অধিকার এমন আয়াতের ভুল ব্যাখ্যাকারী মৌলবাদী অথবা জানিনা কোন্ মতবাদে বিশ্বাস এমন- যাই হোক, উনি আমাদের কথা রাখলেন না, উনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। বাংলার ঐতিহ্য যে ভবন সেই ভবন দখল আর বাংলার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কোনো না কোনো অর্থে তো সমান হতেও পারে। বিস্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে আমরা যেসব লুকায়িত হানাদার বাহিনীকে পাকড়াও করতে সক্ষম হয়েছি, তাদের মধ্যে আজকের উনিও একজন।

উনার গ্রেফতারের কাহিনী সাদ্দামের গ্রেফতারের কাহিনীর মতোই রোমাঞ্চকর। একটি হন্তারক ব্যাঙ পথ হারিয়ে আমাদের ভবন-অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে, তার বিশাল বপু নিয়ে সে বেশি লাফাতেও পারছিল না, ইতোমধ্যে যে দু'চারটি ঘাসফড়িং হত্যা করে এসেছে, এটা তার ঠোটে লেগে থাকা ঘাসফড়িংয়ের রক্ত দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। কিন্তু বাবার-ও বাবা আছে, দাদার-ও দাদা। যেই না এই খুনি ব্যাঙ আমাদের ভবনে প্রবেশ করে, তৎক্ষনাৎ প্রায় শূন্যে ঝাপিয়ে পড়ে তাকে দখল করে বক্ষমান গুইসাপ। প্রথম ছবিটিতে গুইসাপের পাশে যে মৃত ব্যাঙটিকে দেখতে পাচ্ছেন, সেটিই ছিল ওই হতভাগা ব্যাঙ। এই অতি লোভাতুর হত্যাকাণ্ডের কারণেই আজ গুইসাপের এই পরিণতি। আমাদের সংরক্ষণ কাজের একজন শ্রমিক ছিল এই হত্যার রাজসাক্ষী। নিধিরাম সর্দার হিসেবে অচিরেই এই শোক সংবাদ আমি পাই এবং ক্যামেরা নামক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে তাকে অচিরেই তাকে পিছু হটতে বাধ্য করি এবং কবরস্থানে প্রেরণ করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হিজরতকালে তিনি ব্যাঙটি ফেলে যান। এখানে উল্লেখ্য যে, মান দেবো তবু জান দেবো না নীতিতে বিশ্বাসী এই বর্বর গুইসাপটি সদর পথে প্রস্থান না করে ছাদ বেয়ে পেছনের পথে প্রস্থান করে। দ্বিতীয় ছবিতে তার সেই প্রস্থানের চিত্রই প্রস্ফুটিত হয়েছে।

জাতের নামে বজ্জাতি সব

আমি শুনেছি ইউরোপ-আমেরিকায় অনেকে নাকি এখনো বাংলাদেশ-কে পাকিস্তানের অংশ মনে করেন, কেউ কেউ ভারতের একটা প্রদেশ-ও ভাবেন। বাংলাদেশের মানুষকে অবলীলায় ইন্ডিয়ান বা অন্য কোনো জাতীয় হিসেবে চালিয়ে দেন। কিংবা অনেক বাংলাদেশিও নিজেকে বাংলাদেশি না বলে প্রথম পরিচয়টা ইন্ডিয়ান বা এই ধরনের কিছু বলেন। আর মুসলিম? ‘দুইপাতা ইংরেজিপড়া' মুসলমানদের অনেকেই ইসলামী রীতি তো দূরের কথা পারলে বাংলার ইতিহাস থেকে মুসলিম শাসনের ৭০০ বছর-ও মুছে দিতে চান।

অবস্থা কতোটা ঘোরতর বুঝবেন, যখন সরকারপ্রধান '৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তনকেই এইদেশের উন্নয়নের জন্য জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন দেখুন প্রথম আলোর সংবাদ। ব্যক্তিগতভাবে আমি '৭২-এর সংবিধান পছন্দ করি না, তবে আমার পছন্দ করার চেয়েও অনেক বেশি করে সেটি পছন্দ করেন না এই দেশের অবাঙালিরা। কারণ এখানে জাতীয়তাবাদ বলতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়েছে, মহান নেতা বলেছেন- তোমরা সব বাঙালি হ'য়া যাও। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ইসলামিয়া কলেজের নাম বদলে হবে নজরুল কলেজ কিন্তু নটরডেম, হলিক্রস, রামকৃষ্ণ কলেজের নাম থাকবে যেমনছিলতেমন। যেন বাঙালিত্বেই সব জাতীয়তাবাদ, যেন অনৈসলামেই সব ধর্মনিরপেক্ষতা।

জাতীয়তা আসলে কি? সমাজবিজ্ঞান এমন এক অদ্ভুত বিজ্ঞান যা কোনো কিছুর স্থির ব্যাখ্যা দিতে পারে না। জাতীয়তার ধারণা এমনভাবে বদলে গেছে বিভিন্ন সময়ে, এক সময়ের ধারণা অন্য সময় প্রায় উল্টো। তিনটি সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারণার কথা আমরা বলি প্রায়ই- একটা হলো মৌলবাদী, আরেকটা যন্ত্রবাদী আর তৃতীয়টা নির্মাণবাদী। মৌলবাদী ধারণাটা এখন সমাজবিজ্ঞানে সবচেয়ে অচল, কিন্তু ওইটাই আমরা সবচেয়ে বেশি বলি। আমার বাপ-দাদা যেই জাত আছিলো, আমি কি সেই জাত না? আমি কি এই দেশের আদিবাসী না? মণিপুরীরা তো আইছে বিদেশ থেকে, আমার দাদা-পরদাদারা এই দ্যাশের আসল আদিবাসী ইত্যাদি ইত্যাদি এটিই মৌলবাদী ধারণা। অর্থাৎ প্রধানত রক্তের সম্পর্ককে ভিত্তি করে যে জাতীয়তাবাদী ধারণা গড়ে উঠেছে, সেটিই হলো মৌলবাদী জাতীয়তাবাদ। অনেকে একে মূলবাদী, অনেকে প্রাথমিকবাদী অনেকে আদ্যবাদী বা আদিবাদী ইত্যাদি ভাবে বঙ্গায়ন করেছেন। এই তত্ত্বে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো- বংশগরিমা। প্রথমে সৈয়দ পরিবার সেরা, পরে সৈয়দ বংশ সেরা, পরে সৈয়দপুরবাসী সেরা, পরে সৈয়দস্তান-এর মানুষ পৃথিবীর সেরা জাতি, তারপর সৈয়দদের গায়ের রঙ যেহেতু কমলা, সুতরাং পৃথিবীর সকল কমলা মানুষ-ই সেরা, এইভাবে এটা একটা পুরা রেসিস্ট জাতীয়তাবাদে পরিণত হয়। ব্রিটিশদের হাতে রোপিত হলেও জার্মানদের হাতে এই বৃক্ষ ফুলে ফলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। গুস্তাফ কোসিনা এই ক্ষেতের মূল চাষী; হাইনরিখ হিমলার এবং আলফ্রেড রোজেনবার্গ কিছুটা কামলা দিছে।

যন্ত্রবাদী ধারণাটি হলো জাতীয়তা নির্ণয়ের একটা যন্ত্র নির্ধারণ। অর্থাৎ স্বাতন্ত্রসূচক একটা উপাদান (যন্ত্র) খুঁজে বের করে ওইটার সাপেক্ষে জাতীয়তাবাদ নির্ণয়। ওরা যেহেতু বাংলায় কথা বলে সুতরাং ওরা সব বাঙালি, ওরা যেহেতু সব বাইবেল পড়ে সুতরাং ওরা খ্রিস্টান জাতি, ওরা যেহেতু সব লাল পুঁতির মালা পরে সুতরাং ওরা সব লালমালা* জাতি। এইভাবে একটা কিছু খুঁজে বের করে ঐক্য তৈরি করা। কাঠামোবাদী, উপযোগিতাবাদী ইত্যাদি নানা নামে একে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে নামের সাথে মিলিয়ে সংজ্ঞার সামান্য হেরফের আছে, মূল ঘটনা এক-ই। যাই হোক এই সংজ্ঞাও কার্যত অকার্যকর। কারণ দেখা গেছে, একই ভাষায় কথা বললেও ইংরাজগুলা মোটেই এক জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চায় না। অথবা এক ধর্ম হইলেও মুসলমানগুলা সব ফাঁক পাইলেই স্বাধীন হইয়া যায়। এইসব নানা কিসসা কাহিনী দেইখা সমাজবিজ্ঞানীরা কইলো, না থাউক, এইভাবে হইবো না, অন্য রাস্তা দেখি।

নির্মাণবাদীরা এইবার ধরলো ব্যক্তিকে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি কিভাবে সর্বব্যাপী ও সাধারণ ব্যক্তি হয়, তার চেষ্টা। দৈহিক গড়ন, নাম, ভাষা, ইতিহাস, ধর্ম ইত্যাদি নানা ধরনের যাতাকলে পিষ্ট করে এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সাথে কোথায় সবচেয়ে বেশি খাপ খায় সেই বিষয় জানার চেষ্টা করে। এইভাবে ব্যক্তির বিভিন্ন চর্চা, সংস্কৃতি, পরিপ্রেক্ষিত, ইতিহাস ইত্যাদির আলোকে একই সমাজে নানা স্তরায়ন করে জাতীয়তাকে ভাঁজে ভাঁজে সাজাইলো। এর ফলে বাঙালি হিন্দু, বাঙালি মুসলামান, বাংলাদেশি বাঙালি, ভারতীয় বাঙালি, বাংলাদেশি মুসলমান বাঙালি, বাংলাদেশি হিন্দু বাঙালি, বাংলাদেশি নিম্নবর্গের মুসলমান বাঙালি ইত্যাদি নানা ভাবে জাতীয়তাকে চিহ্নায়নের চেষ্টা করে। এর থেকে ‘তোমার দেশ কই?- নোয়াখালী, তোমার জাত কি?- জাইল্যা' এইটা অনেক বেশি যুৎসই মনে কইরা, সমাজবিজ্ঞানীরা কি করি কি করি একটা ধান্দায় পড়ে গেল।

(চলবে)

*লালমালা জাতি নামে আসলেই একটা জাতি চিহ্নিত করা হয়েছিল।

৭৭২ কিস্তির মেগা উপন্যাস : সপ্তম কিস্তি

ডেন্টাল ভাস্করের প্রকৃত নাম ভাস্কর নিবেদন। লাল সালু আন্দোলনের নিবেদিত কর্মী বলে তার নাম ভাস্কর নিবেদন, নাকি তিনি নিবেদন শব্দটি বেশি উচ্চারণ করেন বলে এই নাম, নাকি এটি তার মাতৃপিতৃপ্রদত্ত নাম, তার কিছুই আমি জানি না। ক্যাম্পাসে আসার পর আমি জেনেছি, তিনি চলে যাচ্ছেন। মানে তার পড়ালেখা শেষ, সুতরাং কয়েকবছরের মধ্যেই তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করবেন। একজন বিদায়ী কমরেডের নাম-রহস্য উদ্ঘাটন না করে বরং তার কাছ থেকে তার মহোত্তম গুণাবলি অর্জনের চেষ্টাই অধিকতর ফলদায়ী বলে চলমান কমরেডরা পরামর্শ দিলেন।

তার গুণ-রহস্য জানার চেষ্টায় প্রথমেই জানতে পারলাম, তিনি এক মহান দন্ত-বিশারদ। টুথপেস্ট এবং ব্রাশ এ দুটি পণ্য পুঁজিবাদের ধারক ও বাহক বলে তিনি এই সমস্ত ব্যবহার করেন না। মার্কস ও এঙ্গেলসের মন্ত্রণাগ্রন্থসমূহে দন্তের কোনো মন্ত্র না থাকায় প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব জ্ঞানের ব্যবহারের মাধ্যমেই দন্ত-যত্ন-সমস্যার সমাধান করতে হবে, এটিই ছিল তার মত। প্রকৃতির অন্য সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ দাঁতের যত্নে যে পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে, মানুষকেও সেই পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিই গ্রহণ করতে হবে।

পরে অবশ্য আমি জেনেছি, শেষ দিকে ভাস্কর নিবেদন-এর অপর দু’একটি নাম অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়, সেগুলো হলো ফোম ভাস্কর, বাবল ভাস্কর ইত্যাদি। কেননা শোনা যায়, বুদবুদ বা ফেনোদ্গম করে (যেমন- টুথপেস্ট, সাবান, শ্যাম্পু ইত্যাদি) এমন সকল পুঁজিবাদী পণ্যের বিরুদ্ধেই নাকি তিনি জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন।

শঙ্কু ও শমী বিষয়ক রুদ্ধদ্বার বাহাস যখন ভেতরে চলছিল, হঠাৎ দরোজায় বিকট শব্দে লাথি-ঘুষির শব্দে আমরা চমকিত হলাম। শত্রুলীগ বা শত্রুদলের কে এই অকস্মাৎ আক্রমণ করলো- এই বিষয় নিয়ে কমরেড ন্যান্সি এবং কমরেড পত্তর-এর মধ্যে কিছুটা বিবাদের পর কমরেড মাসুমবাচ্চা দরজা খুলে দেওয়াই শিশুসুলভ কাজ হবে বলে রায় দিলেন। যে কোনো ব্যাপারে শিশুরাই সবচেয়ে যথার্থ সিদ্ধান্ত দিতে পারে বলে কমরেড মাসুমবাচ্চা মনে করেন। তবে বাচ্চা শব্দটি শিশুবান্ধব হয় না বিধায়, কমরেড বাচ্চু বলে তার বিশেষ খ্যাতি ছিল।

এবং ডেন্টাল ভাস্কর। দরজায় দাঁড়িয়েই তিনি নিবেদন করলেন- ‘বিভিন্ন মহল থেকে এই ঘটনা সম্পর্কে যেসব তথ্য আমার কাছে নিবেদিত হয়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে, এই বিষয়ে আমার কিছু নিবেদন রাখা দরকার’। তিনি আরও নিবেদন করলেন- যেহেতু উভয় কমরেড দৃষ্টিপাত শাস্ত্রের শিক্ষার্থী এবং তিনি নিজেও দৃষ্টিপাত বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সুতরাং এই সমস্যায় তার দৃষ্টি নিবেদন অত্যন্ত জরুরি।

দরজার কাছাকাছি কেদারাসমূহে যেসব কমরেডরা বসেছিলেন, তারা সমস্বরে হাঁচতে হাঁচতে দ্রুত কমরেড নিবেদন-এর জন্য আসন ছেড়ে দিলেন এবং নিজেরা একযোগে দূরবর্তী কমরেড কুদ্দুসের পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন। বিষয়টি অস্বস্তিকর দেখালেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এর কোনো বিকল্প ছিল বলে আমার মনে হয় না।

কুদ্দুস পুনরায় মুখ খুললেন- হ্যা শঙ্কু, তুমি বলো- পত্তর অথবা ন্যান্সির সাথে কালুভবনের সামনে বসে না থাকে, কেন তুমি শমীর সাথে বসে থাকো?

কমরেড পত্তর বললেন- এই বিষয়ে শঙ্কুকে একটি কারণদর্শানোর চিঠি দেওয়া হোক।

কুদ্দুস বলেই চললেন- বুঝলাম, তোমরা উভয়েই কালু অনুষদের শিক্ষার্থী, উভয়েই দৃষ্টিপাত বিভাগে একই বর্ষে পড়ো, কিন্তু তাই বলে কালুভবনের সামনে কেন তোমরা একসাথে বসে থাকবা? লাল সালু আন্দোলনে ব্যক্তিবাদের কোনো জায়গা নাই, তোমার যদি কোনো বিশেষ বোধ জাগে, সেই বোধ তুমি ন্যান্সির সাথে আলাপ করো, পত্তরের সাথে আলাপ করো। একটি অষ্টাদশী শিশুর সাথে তোমার আলাপের রহস্য কি? এটি তো শিশু নির্যাতনের সামিল।

পত্তর বললেন- শিশু নির্যাতন বিষয়ে শঙ্কুকে কারণ দর্শানোর জন্য একটি চিঠি দেয়া যেতে পারে।

বাচ্চু এই পর্যায়ে বললেন- এটিকে আপনারা শিশু নির্যাতন না বলে, শিশুদের সাথে সখ্য-ও বলতে পারেন, এবং তাতে আমি তো দোষের কিছু দেখি না।

নূরুল কুদ্দুস হুংকার দিয়ে উঠলেন- কারো ব্যক্তিগত দেখা না দেখা দিয়ে তো আর লালখাতা বাধাই হয়নি। কোটি কোটি বছর ধরে মানুষ তিলে তিলে যে স্বপ্ন দেখেছে, সেই স্বপ্নের দেনাপাওনার হিসেবনিকেশ ওই খাতায়। কোটি কোটি বছর ধরে নির্মিত সেই লালখাতার আমরা ধারক ও বাহক। ব্যক্তিগত ভাললাগা, মন্দলাগা, স্বপ্ন, আকাঙ্খা এইসব পুঁজিবাদী চিন্তা থেকে আমাদেরকে কোটি কোটি হাত দূরে থাকতে হবে। তুমি একজন মহারাজ হয়ে এমন মহাপাপ করতে পারলে কিভাবে?

এতোক্ষণে আমার বোধোদয় ঘটলো, শঙ্কুর পুরো নাম তো শঙ্কু মহারাজ। তবে কি একদা তিনি অন্য কোনো রাজ্যের রাজা ছিলেন? তাই কি এতো প্রশ্ন? আমাদের রাজ্যে এসেছেন আমাদের রাজকন্যা হরণ করতে? কমরেড কুদ্দুস কতকটা তেমনই ইঙ্গিত দিলেন। এরপর তিনি একে একে বলতে লাগলেন, কি কি পাপাচার তারা করেছে। এক সাথে এক বাসে করে সুদূর ঢাকা পর্যন্ত তারা ভ্রমণ করেছে এবং এই দীর্ঘ ৬* ঘণ্টার ভ্রমণে তারা পাশাপাশি সীটেও হয়তো বসেছে। এবং এটি কি ইঙ্গিত বহন করে? কমরেড চীৎকার করে জানতে চাইলেন- আদিম বিকৃতির প্রকাশ নয় এটা?

পটকা ফাটানোর মতো চীৎকার শুনে ভয়ে, নাকি কথা শুনে লজ্জায়, কেন জানি না এই পর্যায়ে শমী ভ্যা ভ্যা করে কান্না শুরু করে দিল।

*১৯৯৭-৯৯ সালে আরিচা রোড সংস্কারের কারণে ঢাকায় যেতে প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগতো।

*** বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই উপন্যাসের ৭ম/৮ম পর্বগুলো সচলে খসড়া আকারে লিখে রেখেছিলাম, আমার নিজের ভুলে না সচলের ভুলে জানিনা, সেগুলো ডিলিট হয়ে গেছে; নতুন করে লেখার কোনো আগ্রহই পাচ্ছিলাম না। ঠাকুরগাঁওয়ে এই মুহূর্তে আমি একটু বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছি, অন্যরা কাজ করছে; কিন্তু আমি অসুস্থতার ভাণ করে কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি। আর সকলেই তো জানেন- অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।

রাজকুমার মুরগির বাচ্চা হতে চেয়েছিল

বখতিয়ার খলজি (আসলে ইখতিয়ার খিলজি)-র ‘বঙ্গবিজয়’ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল মিনহাজ-ই-সিরাজ রচিত তাবকাত-ই-নাসিরি; এই গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক বলছেন- ‘এই গ্রন্থের তথ্যসমূহ একেবার নির্ভুল, অকাট্য ও প্রামাণ্য, কেননা এখানে সরাসরি সেই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যিনি এই কাহিনী শুনেছেন তার নানার কাছে এবং তার নানা এটি শুনেছেন সেই ব্যক্তির কাছে, যার সাথে দেখা হয়েছিল এমন এক ব্যক্তির যিনি বখতিয়ার খলজির কোনো এক অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন’। এতোই প্রামাণ্য সেই ইতিহাস!

রাজকুমারের সোনালী রঙের চামড়ার ব্যাগটার ভেতর কী কী জিনিস আছে, তা নিয়ে আমার জানা বৃত্তান্ত অনেকটা তাবকাত-ই-নাসিরির মতোই, পরম্পরায় শুনেছি ওই ব্যাগের ভেতর নাকি রাজকুমার সাপ পুষতেন, প্রয়োজনের সময় সাপের বিষ জিবের ডগায় নেয়ার জরুরত ছিল। রাজকুমার নিজেও ওই ব্যাগের সাবধানতা বিষয়ে যারপরনাই সচেতন ছিলেন। আমি একবার কি একটা জিনিস খুঁজতে কাছে গিয়ে ওই ব্যাগ ছোঁয়ামাত্র রাজকুমার তেড়ে আসলেন, ব্যাগের ভিতরে কি আছে না জেনে ব্যাগ খুলতে যাস কোন্ সাহসে? ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং তারপর বৃত্তান্ত শুনে সন্তর্পণে ব্যাগের এক কোণা খুলে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে আরো সন্তর্পণে জিনিসটা বের করে আনলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর মনে হবে, সত্যিই হয়তো ব্যাগের ভেতরে সাপখোপ আছে, না হলে এতো সাবধানতার কারণ কী? আমার সন্দিগ্ধ মন অবশ্য বলে, প্রায় দুই দশক ধরে ব্যবহারের কারণে ব্যাগের চেইনের অবস্থা ছিল শোচনীয়, ফলে একবার খোলা হলে তা লাগাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় বলে রাজকুমার যারপরনাই সতর্কতার সাথে ব্যাগের চেইন খোলা-লাগানোর কাজ করতেন এবং অন্য কাউকে ব্যাগ খুলতে দিতেন না। এবং সেই সাথে ফুটনোট দিয়ে দিচ্ছি, রাজকুমার সম্পর্কে যদি কেউ কখনোও কোনো অভিযোগ আনেও রাজকুমার অলস ছিল, এই অভিযোগ কেউ আনতে পারবে না। ফলে আলস্যের কারণে ব্যাগের চেইন বদলানো হয়নি, ব্যাপারটা তা না। আসলে ব্যাগের চেইন সারানোর মতো ১৫ টি টাকা হয়তো রাজকুমারের হাতে কখনো আসেনি। যদি আসতোও তা দিয়ে যে সে কি করতো তা খোদাই মালুম, কেননা মাত্র ১ টাকা পকেটে নিয়ে এই লোক ঢাকা থেকে ইন্ডিয়া ভ্রমণ করে এসেছেন। সেই গল্পেই যাচ্ছি।

রাজকুমার আর আমি ছাড়াও তখন আমাদের বাড়িতে গরু, ছাগল, বাঞ্ছিত কুকুর ও অবাঞ্ছিত বিড়াল, কবুতর এবং হাঁসের পাশাপাশি একগাদা মোরগ-মুরগিও ছিল। বাড়িতে ডিম খাওয়ার মানুষ নেই দেখে সেই ডিম ফুটে ফুটে বাচ্চা হতে হতে মুরগির পাল-ও হয়েছিল বিশাল। একটা মোরগ তো আমার ঘরেই থাকতো, প্রতিদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেত এবং সন্ধ্যা হলে গৃহপ্রবেশ। মজার ব্যাপার ছিল, ওই মোরগটা কখনও আমার ঘর নোংরা করেনি, লক্ষ্মী ছেলের মতো বসবাস করতো। (এই গল্প পরে অন্য একদিন বলবো)

রাজকুমার আমাকে বললেন, জন্মান্তর হলে মুরগির বাচ্চা হবো রে!
-বাচ্চা? কিন্তু বাচ্চা তো চিলে নিয়ে যায়।
-আরে, মা আছে কি করতে? চিল তো চিল, স্বয়ং ***** আসলেও...। বাচ্চা নেওয়ার সময় মুরগির রি-অ্যাকশন দেখছিস?
-রি-অ্যাকশন দেখে কি হবে? বাচ্চা যদি নিয়েই যায়?
-আরে, সবসময় মুরগির পাখনার নিচে লুকিয়ে থাকবো রে!
-কিন্তু বড়ো তো হয়ে যাবা, রাজকুমারদা!
-আরে না, বড়ো হবো ক্যান্? বাচ্চা হয়েই থাকবো। ভগবানের যদি জন্মান্তর-দানের ক্ষমতা থাকে, চিরকাল তবে বড়ো হতে না দেওয়ার ক্ষমতা-ও থাকা উচিৎ।

বাবরি মসজিদ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডকারখানার পর রাজকুমার পরিবার ভিটেমাটি ও চাষাবাদের জমিজমা বিক্রি করে মামার দেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিলো, দেশমাতা নাকি জন্মদাত্রী মা এই বিতর্ক রাজকুমারের মনে এসেছিলো কিনা জানিনা, তবে তরুণ রাজকুমার তখন বাবা-মা-পরিবার-আত্মীয়পরিজনের সঙ্গে ইন্ডিয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এবং সেই থেকে বাংলাদেশে ভূমিহীন, পরিবারহীন এক সংখ্যালঘু পরিণত হলেন।

কিন্তু প্রায়ই রাতের বেলা রাজকুমার হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে মা বলে চেচিয়ে দেশমাতৃকা না মা দুর্গা না জন্মদাত্রী মাতা, কার কথা ভাবতেন এটা বোঝা দুঃসাধ্য ছিল। মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি বলে, পকেটে এক টাকার একটা কয়েন নিয়ে একদিন শাহবাগ থেকে রওনা হলেন রাজকুমার। অনেকেই হয়তো জানেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ঢাকা থেকে জাহাঙ্গীরনগর আসতে বাসভাড়া লাগে এক টাকা। ভক্ত-বন্ধুদের খাতিরে পকেটের এক টাকা পকেটে রেখেই রাজকুমার ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছুলো এবং তারপর শুরু করলো মানিকগঞ্জ যাবার ভাড়ার জন্য ঘ্যানঘ্যান, বেশি না মাত্র ১০ টাকা হলেই শুভ যাত্রা বা নবীনবরণে মানিকগঞ্জ যেতে পারে। জন্মভূমিতে শৈশবের বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে আরো ১০-১৫ টাকা ম্যানেজ করে আরিচা ঘাট, পদ্মা পেরুলেই রাজবাড়িতে আত্মীয়ঘর। সেখান থেকে কিছু জোগাড় করে কোনো মতে ঝিনেদায় গোলাম রসুলের কাছে যেতে পারলেই সে-ই বেনাপোল হয়ে বর্ডার পাড় হওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। অদূরপ্রসারী পরিকল্পনা উপস্থাপনের কৌশলে শামীম, বিশ্বসহ কতিপয় ভক্তঅনুরাগী তার সাথে আরিচা ঘাট পর্যন্ত রওনা হলো; একটা ভ্রমণ-ও হলো, রাজকুমারেরও একটা গতি হলো। আরিচা ঘাটে রাতের আড্ডা সেরে শামীমরা ক্যাম্পাসে আর রাজকুমার পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে মায়ের দর্শনে চললো। আমরা শুনেছি, বর্ডারের গ্রামগুলোতে তাকে ২-৩ দিন থাকতে হয়েছিল এবং কোনো কোনো সময় তাকে একটানা ২৪ ঘণ্টাও হাটতে হয়েছিল। এবং প্রথমবার মামাবাড়ি গিয়ে সে দূরে দাঁড়িয়ে তার মায়ের কাছে খবর পাঠায়- রাজকুমার এসেছে। দেশত্যাগের সিদ্ধান্তের কারণে বাবার প্রতি যে ক্ষোভ ছিল তার, তা প্রথমবার ভারতভ্রমণে প্রকাশ করে রাজকু বাবার সঙ্গে দেখা না করে। মায়ের সাথে ১ ঘণ্টার মতো দেখা করে আবার যে পথে গমন ওই পথেই প্রত্যাবর্তন করে ক্যাম্পাসে। গোলাম রসুল তাকে ব্যাপক সাহায্য করেছে বলে শুনেছি। তবে, এই রীতিতে ভারতভ্রমণের ক্ষেত্রে এরপর সে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করে, এমনকি পকেটে কোনো টাকা না থাকলেও তার পক্ষে ইন্ডিয়া গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসাটা পানির মতো সহজ কর্ম হয়ে দাঁড়ায়। তবে সর্বশেষ ইন্ডিয়া গমন তার দীর্ঘস্থায়ী, সবুজ বাঘের ভাষায় “পরচিম বঙ্গের ডুয়ার্সের চাবাগানে হে নাকি আমোদেই আছে। কুলি কামিনগো নগে চা পাতা ছিড়ে আর মদ গাঞ্জা খাইয়া সাধুর নগাল পইড়া থাকে”।

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি, তুমি কি শেষ পর্যন্ত মুরগির বাচ্চা হতে পারলে রাজকুমারদা?

আব্দুল করিমের হাড়গুলো কোথায়?

আমি মরলে আমার হাড় নিয়েও বাণিজ্য হবে

"আমি মরলে আমার হাড়গুলি নিয়েও বাণিজ্য হবে"- বলেছিলেন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। ২০০৩ এর ১৬ অক্টোবর প্রথমালোতে সেটি ছাপা হয়। এবং মর্মান্তিক হলেও সত্যি, প্রথমালো এই মহান শিল্পীকে যথেষ্ট অত্যাচার করেছে। মারা যাবার কিছুদিন আগেও ভয়াবহ অসুস্থ এই শিল্পীকে তারা বন্ধুসভার মতো একটা চতুর্থশ্রেণীর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এনে হাজির করেছে এবং অসুস্থ শিল্পীকে গান গাইতে বাধ্য করেছে। এই জঘন্য কীর্তিকে আবার তারা তাদের কাগজে মহান কর্ম হিসেবে ফলাও করে ছাপিয়েছেও।

প্রথমালোই শুধু নয়, আমরা যারা শিল্প-সংস্কৃতির সেবায় জান লড়িয়ে দিচ্ছি, আমরাই বা কম কিসে? গিটার-ড্রাম বাজিয়ে তার ভাটিয়ালি ও বাউল ঘরানার গানগুলোকে রক বানিয়ে ফেলেছি, সেটাও মানা যেত, যদি অন্তত তার কথা ও সুরের মূল দিকটা ঠিক রাখতাম। গান লেখার, সুর করার মুরোদ যদি না-ই থাকে, অন্যের লেখা-সুর করা গান তার মতো করেই তো গাইতে হবে, নাকি?

নাগর শিল্পীরা আব্দুল করিমের গান গাইলেন, লন্ডন নিউইয়র্ক থেকে বিভিন্ন শিল্পী ইংরেজি (অথবা হিব্রু-ও হতে পারে, আমি কিছু বুঝতে পারিনি) কিছু ডায়লগ আর কানঝালাপালানিয়া গোলাগুলির শব্দমিউজিকের সাথ তার গানের অ্যালবাম বের করলেন, শুনলাম অনেক বিক্রিও নাকি হয়েছে। কাগজে আর চ্যানেলগুলোতে বস্তার পর বস্তা আলোচনা হচ্ছে, ফেসবুকে আমরা শত শত স্ট্যাটাস আর লিংক পোস্টাইলাম, ক্যাসেট কোম্পানীগুলো তার ক্যাসেটের হাজার হাজার কপি বের করে তুমুল কামিয়ে নিল, প্রচুর শোকসভা হলো বিধান ও অ-বিধানসভায়, কিন্তু লোকটা মারা গেল না খেয়ে, প্রায় বিনা চিকিৎসায়। ছেলে নূর জালালের ভাষ্যমতে, শেষের দিকে আর জাতীয়/আঞ্চলিক পদক আনতে যেতে চাইতেন না, কারণ পদক নিয়ে বাড়ি ফেরার গাড়ি ভাড়া থাকতো না।

ফেসবুকে নজরুল ভাই মন্তব্য করেছিলেন, "এতদিন কিছুই হয় নাই, শাহ্ আব্দুল করিমের গান নিয়ে খেলা এবং ব্যবসা এখন মাত্র শুরু হবে। অপেক্ষা করেন...।"

আব্দুল করিম জানতেন, তাকে নিয়ে ব্যবসা হচ্ছে এবং আরো অনেক হবে। বাংলাদেশের সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি তিনি ভাল করেই বুঝতেন। বুঝতেন বলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে শুরু করে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি পর্যন্ত সবকিছুই তার গানে উঠে এসেছে। সমকাল থেকে দূরে থেকে এক আধ্যাত্মিক কূপে বসবাস করেননি তিনি, অন্য অনেক মারিফতি বাউলের মতো। আধ্যাত্মিকতা/বাউলিয়ানা তার সঙ্গীতের ভিত্তি হলেও সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি তিনি অনুধাবন করেছিলেন বলেই বলে গেছেন, মরার পর হাড়গোড়গুলো নিয়েও ব্যবসা হবে। তবে সেই ব্যবসা এখনো শুরু হয়নি। নজরুল ভাই, অপেক্ষা করতেছি, সেই ব্যবসাটা কবে শুরু হয়, তা দেখার জন্য।